নাগরিকত্ব নিয়ে এবার আইনি বিতর্কে সিজেপি নেতা সৌরভ দাস! তাঁর বিরুদ্ধে সরাসরি আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন তামিলনাড়ুর এক ব্যবসায়ী। অভিযোগ, সৌরভ দাসের জন্ম নেপালে। এমনকি, তাঁর আসল নাম নাকি যোগেশ শর্মা! এই অভিযোগ তুলে সৌরভের পাসপোর্ট ও আধার কার্ড বাতিলের আবেদন জানানো হয়েছে মাদ্রাজ হাইকোর্টে। শুধু তাই নয়, তাঁর সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট ব্লক করারও দাবি জানিয়েছেন আবেদনকারী। আর এই আবেদনের পরেই কেন্দ্রের একাধিক মন্ত্রক ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নোটিস পাঠিয়েছে আদালত। ছ’সপ্তাহের মধ্যে জবাব চাওয়া হয়েছে। কিন্তু ঠিক কী অভিযোগ উঠেছে সৌরভের বিরুদ্ধে? কেন তাঁর নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুললেন ওই ব্যবসায়ী? আর এই ঘটনায় কী প্রতিক্রিয়া সিজেপি নেতাদের?

সৌরভের নাগরিকত্ব নিয়ে কী অভিযোগ?
তামিলনাড়ুর কাঞ্চিপুরমের বাসিন্দা গণেশ কুমার নামে এক ব্যবসায়ী এই আবেদন করেছেন মাদ্রাজ হাইকোর্টে। তাঁর অভিযোগ, সিজেপি নেতা সৌরভ দাস আসলে জন্মসূত্রে নেপালের নাগরিক। আবেদনকারীর দাবি, সৌরভের আসল নাম যোগেশ শর্মা। তাই তাঁর নাগরিকত্ব এবং ভারতে ব্যবহৃত পরিচয়পত্রের বৈধতা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। এই অভিযোগের ভিত্তিতেই সৌরভের পাসপোর্ট ও আধার কার্ড বাতিল করার আবেদন জানিয়েছেন গণেশ কুমার। তবে মনে রাখতে হবে, এগুলি আবেদনকারীর অভিযোগ।
এই মামলায় শুধু নাগরিকত্ব যাচাইয়ের আবেদনই করা হয়নি। আবেদনকারীর আরও অভিযোগ, ভারতের বিচার ব্যবস্থা এবং সুপ্রিম কোর্ট সম্পর্কে কুরুচিকর মন্তব্য করেছেন সৌরভ দাস। তাঁর বক্তব্য, বিচার ব্যবস্থা নিয়ে এই ধরনের মন্তব্য করা উচিত নয়। সেই কারণেই সৌরভ যাতে ভবিষ্যতে বিচার বিভাগ ও সুপ্রিম কোর্ট সম্পর্কে এ ধরনের মন্তব্য করতে না পারেন, সেই ব্যবস্থা নেওয়ার আবেদন জানিয়েছেন তিনি। এমনকি, ‘সৌরভ দাস’ নামে থাকা তাঁর এক্স এবং ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট ব্লক করার নির্দেশ দেওয়ারও আর্জি জানানো হয়েছে আদালতে। এই বিষয়ে ইলেকট্রনিক্স ও টেলিকমিউনিকেশনস মন্ত্রকের হস্তক্ষেপ চেয়েছেন আবেদনকারী।
গণেশ কুমারের আবেদনের ভিত্তিতে মাদ্রাজ হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি এস এ ধর্মাধিকারী এবং বিচারপতি জি অরুল মুরুগানের ডিভিশন বেঞ্চ কেন্দ্রের একাধিক মন্ত্রক ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নোটিস পাঠিয়েছে। নোটিস পাঠানো হয়েছে কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রক, আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস এবং আধার কর্তৃপক্ষ বা UIDAI-কে। আগামী ছ’সপ্তাহের মধ্যে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নিজেদের বক্তব্য জানাতে বলা হয়েছে। আবেদনকারীর আইনজীবী বি জগন্নাথ আদালতে দাবি করেছেন, সৌরভের বিরুদ্ধে তাঁরা আগেও অভিযোগ জানিয়েছিলেন। কিন্তু প্রশাসনের তরফে কোনও কার্যকর পদক্ষেপ করা হয়নি। তাঁর বক্তব্য, বিচার ব্যবস্থা নিয়ে সৌরভ যেভাবে মন্তব্য করছেন, তা গ্রহণযোগ্য নয়। সরকার এবং বিচার বিভাগ সম্পর্কে এভাবে উপদেশ দেওয়ার অধিকার তাঁর নেই বলেও দাবি করেছেন আইনজীবী।
সৌরভ দাসকে ঘিরে এই বিতর্কের আগে একই ধরনের প্রশ্ন উঠেছিল ইউটিউবার ধ্রুব রাঠীকে নিয়েও। অক্টোবরের শুরুতে বেঙ্গালুরুর ফ্রিডম পার্কে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে একটি রাজনৈতিক প্রতিবাদ কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছিলেন ধ্রুব। এরপর তাঁর নাগরিকত্ব, ভিসা এবং ভারতে থাকার বৈধতা যাচাইয়ের দাবি ওঠে। কর্ণাটকের প্রাক্তন পুলিশ কমিশনার তথা বিজেপি নেতা ভাস্কর রাও কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র সচিবকে চিঠি দিয়ে এই বিষয়ে তদন্তের আর্জি জানান। সমালোচকদের একাংশের দাবি ছিল, ধ্রুব রাঠী জার্মান নাগরিক। তাই বিদেশি নাগরিক হিসেবে ভারতের রাজনৈতিক প্রতিবাদে তাঁর অংশগ্রহণ নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। তবে সমস্ত অভিযোগ উড়িয়ে দেন ধ্রুব রাঠী। নাগরিকত্ব নিয়ে বিতর্কের জবাব দিতে মুক্তির পর ১১ অক্টোবর সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি ভিডিও প্রকাশ করেন জনপ্রিয় ইউটিউবার ধ্রুব রাঠী। ভিডিওতে ক্যামেরার সামনে নিজের ভারতীয় পাসপোর্ট তুলে ধরে তিনি স্পষ্ট জানান, তিনি ভারতীয় নাগরিক এবং ভবিষ্যতেও ভারতীয় নাগরিক থাকবেন। একইসঙ্গে তাঁর বক্তব্য, একজন সাধারণ ভারতীয় নাগরিক হিসেবে সংবিধান তাঁকে যে অধিকার দিয়েছে, সেই অধিকার তাঁরও রয়েছে। তাই দেশের বিভিন্ন ইস্যুতে নিজের মতামত প্রকাশ এবং প্রতিবাদ জারি রাখবেন তিনি।
সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকেকেও ঘিরে নাগরিকত্ব বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। ২০২৬ সালের জুনে তাঁর আমেরিকা থেকে ভারতে ফেরা এবং ভিসা অপব্যবহারের অভিযোগ নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল জানান, অভিজিৎ ভারতীয় নাগরিক কি না, সে বিষয়ে সরকারের কাছে তখন নির্দিষ্ট তথ্য নেই। পাশাপাশি, তাঁর বহিষ্কার বা ভিসা অপব্যবহার নিয়ে মার্কিন প্রশাসনের কাছ থেকেও কোনও আনুষ্ঠানিক তথ্য আসেনি। অন্যদিকে, নিজের নাগরিকত্ব এবং আমেরিকা থেকে ভারতে ফেরা নিয়ে ওঠা বিতর্কের জবাবে কড়া প্রতিক্রিয়া জানান সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে। তিনি নিজেকে একজন গর্বিত ভারতীয় নাগরিক বলে দাবি করেন এবং তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলিকে ভিত্তিহীন প্রচার বলে উড়িয়ে দেন। অভিজিতের বক্তব্য, তিনি কোনও বিদেশি নাগরিক নন, এমনকি অন্য কোনও দেশের গ্রিন কার্ডও নেননি। বৈধ ভারতীয় পাসপোর্ট নিয়েই উচ্চশিক্ষার জন্য আমেরিকায় গিয়েছিলেন তিনি। তাঁর আরও দাবি, সিজেপির ছাত্র ও তরুণদের আন্দোলন যখন দেশে গতি পাচ্ছিল এবং সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলছিল, ঠিক তখনই আন্দোলনকে দুর্বল করতে এবং মানুষের নজর ঘোরাতেই তাঁর নাগরিকত্ব নিয়ে পরিকল্পিতভাবে বিতর্ক তৈরি করা হয়। বহুজাতিক সংস্থায় বড় চাকরির সুযোগ ছেড়ে দেশের মানুষের অধিকার রক্ষার লড়াইয়ে সামিল হতেই স্বেচ্ছায় ভারতে ফিরে এসেছেন বলেও জানান অভিজিৎ।