বিশ্বজিৎ নস্কর, নিজস্ব সংবাদদাতা : দক্ষিণ ২৪ পরগনার ডায়মন্ড হারবারে রাজনৈতিক উত্তেজনার আবহে সামনে এল এক চাঞ্চল্যকর অভিযোগ। বিজেপি সমর্থন করার ‘অপরাধে’ এক বিজেপি কর্মী-সমর্থককে বেধড়ক মারধর, প্রাণনাশের হুমকি এবং দীর্ঘদিন আতঙ্কে রাখার অভিযোগ উঠেছে একাধিক তৃণমূল কাউন্সিলরের বিরুদ্ধে। ঘটনাকে কেন্দ্র করে ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক চাপানউতোর শুরু হয়েছে ডায়মন্ড হারবারে। যদিও অভিযুক্তদের পক্ষ থেকে এখনও পর্যন্ত কোনও প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ডায়মন্ড হারবারের বাসিন্দা সৈকত দাস নামে এক বিজেপি কর্মী-সমর্থক। তাঁর অভিযোগ, শুধুমাত্র রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণে তাঁকে মারধরের শিকার হতে হয়েছে। ঘটনার জেরে তিনি দীর্ঘদিন আতঙ্কে দিন কাটিয়েছেন বলেও দাবি করেছেন। রাজ্যের রাজনৈতিক পালাবদলের পর অবশেষে সাহস সঞ্চয় করে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ডায়মন্ড হারবার থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন তিনি।
স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, ঘটনাটি ঘটে গত ১৮ ডিসেম্বর ২০২৫ সালে। অভিযোগ অনুযায়ী, ওই দিন ডায়মন্ড হারবারের কলেজপাড়া এলাকায় ‘জয় শ্রীরাম’ গান চালিয়েছিলেন সৈকত দাস। সেই ঘটনাকে কেন্দ্র করেই তাঁর উপর চড়াও হওয়ার অভিযোগ ওঠে কয়েকজন তৃণমূল নেতার বিরুদ্ধে। অভিযোগে নাম রয়েছে ডায়মন্ড হারবার পৌরসভার ১৩ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর অমিত সাহা, ৪ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর তথা পৌরসভার ভাইস চেয়ারম্যান রাজর্ষি দাস, ১ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর দিব্যেন্দু হালদার এবং ১১ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর আলোক হালদারের।
সৈকত দাসের অভিযোগ, ওই দিন আচমকাই একদল ব্যক্তি তাঁর উপর হামলা চালায়। লোহার রড, বাঁশ এবং অন্যান্য জিনিস দিয়ে তাঁকে বেধড়ক মারধর করা হয় বলে অভিযোগ। শুধু তাই নয়, তাঁকে শ্বাসরোধ করে খুনের চেষ্টাও করা হয় বলে দাবি তাঁর। মারধরের জেরে গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে উদ্ধার করে ডায়মন্ড হারবার জেলা হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। সেখানে তাঁর চিকিৎসা চলে।
অভিযোগ আরও গুরুতর মোড় নেয় যখন সৈকতের তরফে দাবি করা হয়, ঘটনার পর অভিযুক্তরা তাঁকে এবং তাঁর পরিবারকে হুমকি দিতে শুরু করে। থানায় অভিযোগ জানালে বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর এবং পরিবারের সদস্যদের মারধরের হুমকি দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ। ফলে দীর্ঘদিন ধরে ভয়ের মধ্যে দিন কাটাতে বাধ্য হন তিনি। আতঙ্কের কারণেই এতদিন তিনি প্রকাশ্যে অভিযোগ জানাননি বলে দাবি করেছেন সৈকত।
সৈকতের কথায়, রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানাতে তিনি সাহস পাচ্ছিলেন না। প্রাণনাশের আশঙ্কায় পরিবার নিয়েও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছিলেন। তবে রাজ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের পর তিনি নতুন করে আইনের উপর আস্থা রেখে থানার দ্বারস্থ হন।
এদিকে, এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সরব হয়েছে বিজেপি নেতৃত্ব। ডায়মন্ড হারবার টাউন বিজেপির সাধারণ সম্পাদক প্রীতম হালদার বলেন, “ঘটনার কথা আমাদের কানে এসেছে। অত্যন্ত নিন্দনীয় ও নক্কারজনক ঘটনা ঘটেছে। শুধুমাত্র বিজেপি করার কারণে এক যুবককে এভাবে মারধর করা হয়েছে বলে আমরা জানতে পেরেছি। শুধু মারধর নয়, তাঁর উপর অমানবিক নির্যাতন চালানো হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। অভিযুক্তরা অত্যন্ত প্রভাবশালী হওয়ায় এতদিন ভয়ে মুখ খুলতে পারেননি সৈকত।”
তিনি আরও দাবি করেন, বিজেপির সহযোগিতাতেই অবশেষে সৈকত দাস থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। প্রীতম হালদারের বক্তব্য, “আমরা চাই পুলিশ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করুক। যদি অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হয়, তাহলে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হোক। কোনও রাজনৈতিক পরিচয় যেন তদন্তের ক্ষেত্রে বাধা না হয়।”
ঘটনাকে কেন্দ্র করে ডায়মন্ড হারবারের রাজনৈতিক মহলে শুরু হয়েছে জোর চর্চা। একদিকে বিজেপি এই ঘটনাকে রাজনৈতিক সন্ত্রাসের উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরছে, অন্যদিকে তৃণমূলের পক্ষ থেকে এখনও পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া সামনে আসেনি। তবে রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, বিষয়টি নিয়ে আগামী দিনে আরও বিতর্ক তৈরি হতে পারে।
ইতিমধ্যেই অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত শুরু করেছে ডায়মন্ড হারবার থানার পুলিশ। পুলিশ সূত্রে খবর, লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে ঘটনার বিভিন্ন দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে। অভিযোগকারীর বক্তব্য নেওয়ার পাশাপাশি ঘটনার সময়কার সম্ভাব্য সাক্ষী, চিকিৎসা সংক্রান্ত নথি এবং অন্যান্য তথ্যও সংগ্রহ করা হতে পারে। প্রয়োজনে অভিযুক্তদের জিজ্ঞাসাবাদও করা হতে পারে বলে জানা যাচ্ছে।
তবে এই ধরনের অভিযোগ সামনে আসতেই রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, মত প্রকাশের স্বাধীনতা এবং বিরোধী দলের কর্মীদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। রাজনৈতিক মহলের একাংশের বক্তব্য, যদি সত্যিই শুধুমাত্র রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণে কারও উপর হামলা হয়ে থাকে, তবে তা গণতান্ত্রিক পরিবেশের পক্ষে অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
অন্যদিকে, আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, অভিযোগের গুরুত্ব বিবেচনায় পুলিশকে নিরপেক্ষ ও দ্রুত তদন্ত করতে হবে। কারণ অভিযোগে মারধর, খুনের চেষ্টা, ভয় দেখানো এবং গুরুতর হুমকির মতো বিষয় রয়েছে। সেই কারণে তদন্তে সমস্ত দিক খতিয়ে দেখা জরুরি।
এখন দেখার, তদন্তে কী উঠে আসে এবং অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ কী পদক্ষেপ করে। একই সঙ্গে নজর থাকবে অভিযুক্তদের প্রতিক্রিয়ার দিকেও। তবে আপাতত ডায়মন্ড হারবারের এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক পারদ যে চড়েছে, তা বলাই বাহুল্য।