সূচনা পল্যে, সাংবাদিক : রাত নামতেই হঠাৎ অন্ধকারে ডুবে যাচ্ছে শহর। পেট্রোল পাম্পে লাইন, স্কুল বন্ধ, অফিসে কমছে কাজের দিন- শুনতে যেন কোনও দুর্যোগের গল্প। কিন্তু না, এটা প্রাকৃতিক বিপর্যয় নয়, আবার মহামারিও নয়। এই সংকটের নাম- জ্বালানি সঙ্কট। আর সেই সঙ্কট এতটাই গভীর যে বিশ্বের একাধিক দেশ এখন কার্যত ‘এনার্জি লকডাউন’-এর পথে হাঁটছে। এই অস্বাভাবিক পরিস্থিতির সূত্রপাত পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ থেকে।

২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া ইরান-আমেরিকা-ইজ়রায়েল সংঘাত ধীরে ধীরে এমন জায়গায় পৌঁছেছে, যেখানে শুধু যুদ্ধক্ষেত্র নয়, গোটা বিশ্বের অর্থনীতি তার ধাক্কা অনুভব করছে। বিশেষ করে জ্বালানি সরবরাহে বিপর্যয় তৈরি হয়েছে। কারণ, বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহণের পথগুলির একটি- হরমুজ় প্রণালী- এই সংঘাতের জেরে কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। ফলস্বরূপ, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম হু হু করে বেড়েছে, আর সেই ঢেউ গিয়ে আছড়ে পড়ছে একের পর এক দেশের অর্থনীতিতে।
এই পরিস্থিতিতেই সামনে এসেছে “এনার্জি লকডাউন” শব্দটি। সাধারণ লকডাউনের মতো এটি মানুষের চলাচল বন্ধ করে না, কিন্তু জ্বালানি ব্যবহারে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে। অর্থাৎ, সরকার বাধ্য হয়ে এমন কিছু পদক্ষেপ নেয় যাতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির ব্যবহার কমানো যায়। এর মধ্যে রয়েছে- জ্বালানির রেশনিং, অফিসে ওয়ার্ক ফ্রম হোম, স্কুল-কলেজ বন্ধ রাখা, নির্দিষ্ট সময় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখা, এমনকি যানবাহনের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ।
এই পরিস্থিতির সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ দেখা যাচ্ছে পাকিস্তানে। সেখানে সরকার ইতিমধ্যেই সপ্তাহে চার দিন কাজের নিয়ম চালু করেছে সরকারি দফতরে। পাশাপাশি ৫০ শতাংশ কর্মীকে ওয়ার্ক ফ্রম হোম করতে বলা হয়েছে, যাতে জ্বালানি খরচ কমানো যায়। স্কুল-কলেজ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে চলছে অনলাইন ক্লাস। শুধু তাই নয়, সরকারি গাড়ির ব্যবহারেও কড়া নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছে। জ্বালানির দামও সেখানে একলাফে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। ফলে সাধারণ মানুষের উপর চাপ আরও বেড়েছে।
একই ছবি বাংলাদেশেও। বিদ্যুৎ বাঁচাতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলি আগেভাগেই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। সরকারি অফিসে অপ্রয়োজনীয় আলো নিভিয়ে রাখা হচ্ছে, এসির তাপমাত্রা ২৫ ডিগ্রি বা তার বেশি রাখতে বলা হয়েছে। দেশের বিভিন্ন জায়গায় নির্দিষ্ট সময় অন্তর বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন করা হচ্ছে, যাতে জরুরি পরিষেবাগুলিকে চালু রাখা যায়। পেট্রোল পাম্পগুলিতেও জ্বালানি বিক্রিতে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছে, যাতে মজুত ফুরিয়ে না যায়।
দক্ষিণ আফ্রিকাও একই সঙ্কটে জর্জরিত। সেখানে জ্বালানি বিক্রিতে কোটা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। বিদ্যুৎ ব্যবস্থাও চাপের মুখে। নিয়মিত লোডশেডিং-এর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতি সামাল দিতে জরুরি ভিত্তিতে জ্বালানি আমদানির চেষ্টা চলছে।
শুধু এই তিন দেশই নয়, এশিয়ার আরও বহু দেশ এই সঙ্কটের মধ্যে পড়েছে। ফিলিপিন্স ইতিমধ্যেই আনুষ্ঠানিকভাবে “এনার্জি লকডাউন” ঘোষণা করেছে। সেখানে প্রতিদিন নির্দিষ্ট পরিমাণের বেশি জ্বালানি নেওয়া যাবে না। বড় বড় শপিং মলগুলির সময় কমিয়ে দেওয়া হয়েছে বিদ্যুৎ বাঁচানোর জন্য।
শ্রীলঙ্কা আরও এক ধাপ এগিয়ে গিয়ে প্রতি সপ্তাহে একদিন ছুটি ঘোষণা করেছে, যাতে জ্বালানি খরচ কমে। মায়ানমারে চালু হয়েছে অড-ইভেন নিয়ম- একদিন এক ধরনের গাড়ি, পরের দিন অন্য ধরনের গাড়ি চলবে। ভিয়েতনামে জ্বালানির দাম ৫০-৬০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে গিয়েছে। এই সব কিছুর মূল কারণ একটাই—জ্বালানির সরবরাহে বিপর্যয়। হরমুজ় প্রণালী দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল পরিবহণ হয়। সেই পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তেলের জোগান কমে গেছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বেড়েছে। আর যেসব দেশ জ্বালানির জন্য আমদানির উপর নির্ভরশীল, তারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
এই পরিস্থিতির প্রভাব শুধু জ্বালানিতে সীমাবদ্ধ নয়। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে খাদ্যদ্রব্য, পরিবহণ, শিল্প উৎপাদন- সব ক্ষেত্রেই। কারণ, জ্বালানি হল অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। জ্বালানির দাম বাড়লে সব কিছুর খরচ বেড়ে যায়। ফলে বাড়ে মুদ্রাস্ফীতি, কমে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা। এখন প্রশ্ন উঠছে- ভারত কি এই “এনার্জি লকডাউন”-এর পথে হাঁটতে পারে? আপাতত কেন্দ্রীয় সরকারের বক্তব্য, দেশে জ্বালানির পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। পেট্রোল, ডিজ়েল বা রান্নার গ্যাসের সরবরাহে কোনও ঘাটতি নেই। দেশের সমস্ত রিফাইনারি স্বাভাবিক ভাবে কাজ করছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, যদি এই যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে ভারতের উপরেও চাপ বাড়তে পারে। কারণ ভারতও জ্বালানির জন্য অনেকটাই আমদানির উপর নির্ভরশীল। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে তার প্রভাব দেশের অর্থনীতিতে পড়বেই। তাই ভবিষ্যতে ভারতেও কিছু জ্বালানি সাশ্রয়মূলক পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে- যেমন অফিসে আংশিক ওয়ার্ক ফ্রম হোম, বিদ্যুৎ ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ, কিংবা জ্বালানির অপচয় রোধে সচেতনতা অভিযান। যদিও সম্পূর্ণ লকডাউনের সম্ভাবনা আপাতত নেই বলেই জানিয়েছে সরকার।
সব মিলিয়ে, পশ্চিম এশিয়ার এই যুদ্ধ শুধু একটি আঞ্চলিক সংঘাত নয়- এটি এখন একটি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সঙ্কটে পরিণত হয়েছে। “এনার্জি লকডাউন” তারই একটি বাস্তব চিত্র। যেখানে যুদ্ধের আগুন ছড়িয়ে পড়ছে প্রতিটি দেশের রান্নাঘর, অফিস, রাস্তাঘাট- সব জায়গায়। এই পরিস্থিতি কতদিন চলবে, যুদ্ধ কবে থামবে, আর বিশ্ব অর্থনীতি কবে স্বাভাবিক ছন্দে ফিরবে- সেই প্রশ্নের উত্তর এখনও অজানা। তবে একটা বিষয় স্পষ্ট- জ্বালানির উপর নির্ভরতা কমানো এবং বিকল্প শক্তির দিকে ঝোঁক- এই দুই-ই আগামী দিনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এবং সমাধান হতে চলেছে। ব্যুরো রিপোর্ট আর প্লাস নিউজ।