সত্যজিৎ চক্রবর্তী, নিজস্ব সংবাদদাতা : দলীয় নেতৃত্বের একাংশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলার পাশাপাশি রাজ্যে সাম্প্রতিক অপরাধ ও দুর্নীতি নিয়েও চিঠিতে বিস্ফোরক মন্তব্য। আদর্শনিষ্ঠ ও মানবিক রাজনীতির পক্ষে সওয়াল। দলের রদবদলের মাঝেই কিছুদিন আগেই নিজের ফেসবুক ওয়ালে এক রহস্যময় পোস্ট দেখা যায় তাঁর। তৃণমূলের বহু যুগের সৈনিক তিনি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে নানা সময়ে পথে নেমে আন্দোলনে তাঁকে দেখা গিয়েছে। তিন তিনবার সাংসদ তিনি। সাংগঠনিক জেলার সভাপতি এবং মহিলা তৃণমূল কংগ্রেসের সভানেত্রীর পদও সামলেছেন। লোকসভাতেও তাঁকে গুরুত্বপূর্ণ পদ দিয়েছিলেন তৃণমূল সুপ্রিমো। আইপ্যাক নিয়েও সরব হয়েছিলেন তিনি। ফেসবুকে অভিমান প্রকাশ। নিরাপত্তা বৃদ্ধি করেছেন। এবার বড় সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন তিনি।

তিনি আর কেউ নন, বারাসতের সাংসদ কাকলি ঘোষ দস্তিদার। লোকসভাতেও তাঁকে গুরুত্বপূর্ণ পদ দিয়েছিলেন তৃণমূল সুপ্রিমো। তা হল, মুখ্য সচেতক বা চিফ হুইপ। বিধানসভা ভোটে ভরাডুবির পরে গত ১৪ মে কালীঘাটে তৃণমূলের সাংসদদের নিয়ে একটি বৈঠক করেন মমতা। কিন্তু ছাব্বিশের বিধানসভা ভোটে দলের বড় বিপর্যয়ের পর ওই পদ থেকে তাঁকে সরিয়ে দেওয়া হয়। চিফ হুইপের দায়িত্ব পান আরেক বর্ষীয়ান সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। কল্যাণকে সংসদীয় দলের মুখ্যসচেতক করার পরের দিনই, কাকলি গোঁসা করে পোস্ট করেন সোশাল মিডিয়ায়। লেখেন, ৭৬ থেকে পরিচয়, ৮৪-তে পথ চলা শুরু। চার দশকের আনুগত্যের জন্য পুরস্কৃত হলাম। সোশ্যাল মাধ্যমে তাঁর অভিমান প্রকাশিত হওয়ার পর রাজনৈতিক মহলে বেশ চর্চার জন্ম হয়েছিল।
২৩ মে ২০২৬ তারিখ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে দেওয়া এক চিঠিতে বারাসতের সাংসদ লেখেন, নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে আবেদন, তিনি বিগত দিনের মতো নিষ্ঠাবান পুরনো কর্মীদের নিয়ে কাজ করলে দলের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হবে মনে হয়। ভুঁইফোঁড় সংস্থা দিয়ে কঠিন কাজ হয় বলে মনে হয় না। রাজনৈতিক মহলের মতে, এখানে ভুঁইফোঁড় সংস্থা বলতে তিনি সরাসরি অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠ ভোটকুশলী সংস্থা আইপ্যাক-কেই নিশানা করেন। নির্বাচনে হারের পর দলের স্ট্র্যাটেজি এবং নতুনদের অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়ার নীতিকে প্রবীণ নেত্রী যে কোনওভাবেই মেনে নিচ্ছেন না, তা এই এক লাইনেই পরিষ্কার। এর আগেও আইপ্যাকের ভূমিকা নিয়ে বারবার সরব হয়েছিলেন বিক্ষুব্ধ তৃণমূল নেতারা। এবার সেই তালিকায় নাম জুড়ল কাকলি ঘোষ দস্তিদারের।
দলীয় নেতৃত্বের একাংশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলার পাশাপাশি রাজ্যে সাম্প্রতিক অপরাধ ও দুর্নীতি নিয়েও চিঠিতে বিস্ফোরক মন্তব্য করেন কাকলি ঘোষ দস্তিদার। সুব্রত বক্সিকে তিনি লেখেন, পশ্চিমবঙ্গে সাম্প্রতিক সময়ে অপরাধ ও দুর্নীতির কিছু উদ্বেগজনক ঘটনা সাধারণ মানুষের মনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ও আশঙ্কার সৃষ্টি করেছে। গণতন্ত্রকে আরও শক্তিশালী করতে হলে রাজনীতিতে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, দায়বদ্ধতা, শিষ্টাচার এবং মানুষের প্রতি দায়িত্ব ও মূল্যবোধকে আরও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। এখানেই শেষ নয়, আদর্শনিষ্ঠ ও মানবিক রাজনীতির পক্ষে সওয়াল করে তিনি লেখেন, নির্বাচনে বারাসত জেলায় দলের ফলাফল আশানুরূপ না হওয়ার নৈতিক দায় নিয়েই তিনি জেলা সভাপতির দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি চান।
চার দশকের রাজনৈতিক জীবনে দলকে দিয়েছেন সময়, শ্রম আর আনুগত্য। কিন্তু বিধানসভা ভোটে ভরাডুবির পর তৃণমূলের অন্দরে যে অসন্তোষ আর ক্ষোভ জমছে, কাকলি ঘোষ দস্তিদারের চিঠি যেন তারই বিস্ফোরক বহিঃপ্রকাশ। আইপ্যাকের ভূমিকা থেকে শুরু করে দলীয় নেতৃত্বের একাংশ, দুর্নীতি, অপরাধ। একাধিক ইস্যুতে সরাসরি প্রশ্ন তুলেছেন বর্ষীয়ান এই নেত্রী। শুধু পদত্যাগ নয়, তাঁর চিঠি কার্যত তৃণমূলের অন্দরমহলের অস্বস্তিকেই সামনে এনে দিল।