ঋতব্রত শিবিরে কি মন টিকছে না সাবিনা ইয়াসমিনের। নাকি মানিয়ে নিতে পারছেন না। চাপের মুখে পড়ে শিবির বদল করে কি পস্তাতে হচ্ছে তাঁকে। তাঁর ঘন ঘন সিদ্ধান্ত বদল দেখেই অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন। ঋতব্রত তৃণমূলে পাওয়া পদ ছেড়েছেন প্রাক্তন মন্ত্রী সাবিনা। শারীরিক কারণ দেখিয়ে পদ ছেড়েছেন বটে। কিন্তু তাঁর জেলায় কান পাতলেই শোনা যাচ্ছে অন্য কথা। পদ ছাড়ার পিছনে তাহলে কোন কারণ তবে কি মোথাবাড়িকাণ্ড নিয়ে চাপ বাড়ছে তাঁর। নাকি ঘরওয়াপসি হতে চলেছে সাবিনার।

সাবিনা ইয়াসমিন। এই প্রাক্তন মন্ত্রী তথা সুজাপুরের বিধায়কের নামে রয়েছে এনআইএ কেস। মোথাবাড়িকাণ্ডে সুজাপুরের বিধায়ক সাবিনা ইয়াসমিনকে তলব করেছিল এনআইএ । বিধানসভা ভোটের আগে এসআইআরের এর কাজ করতে গিয়ে, মালদার মোথাবাড়িতে হামলার মুখে পড়েছিলেন খোদ বিচারকরা। সেই ঘটনায় কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা তলব করে সুজাপুরের বিধায়ক সাবিনা ইয়াসমিনকে। মোথাবাড়িতে ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে এসআইআরের কাজে আসা বিচারকদের বিডিও অফিসে আটকে রাখা হয়েছিল। মাঝরাতে কোনওমতে বেরোতে পারলেও, রাস্তায় তাঁদের গাড়িতে হামলা চালানো হয়। স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে মামলা রুজু করে সুপ্রিম কোর্ট। সংবিধানের ১৪২ ধারা প্রয়োগ করে, এনআইকে তদন্তভার দেয় সর্বোচ্চ আদালত। মোথাবাড়িকাণ্ডে আগেই জড়িয়ে গিয়েছিল সাবিনা ইয়াসমিনের নাম। ঘটনার সময় তিনি মোথাবাড়ির তৃণমূল বিধায়ক ছিলেন। ভোটে হারের পর মমতা তৃণমূল কংগ্রেস থেকে বেরিয়ে ঋতব্রত শিবিরে যোগ দিয়েছিলেন সাবিনা। রাজ্যে পালাবদলের পরই বিদ্রোহের সুর শোনা যায় তৃণমূলের অন্দরে।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গ ছাড়েন একসঙ্গে প্রায় ৬০ জন বিধায়ক। ঋতব্রতকে বিধানসভার বিরোধী দলনেতা হিসেবে বেছে নেন তাঁরা। যদিও মমতার শিবির চেয়েছিল, বর্ষীয়ান নেতা তথা বালিগঞ্জের বিধায়ক শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়কে বিরোধী দলনেতা করতে। কালীঘাট তৃণমূলের হাত ছেড়ে যাঁরা ঋতব্রতের শিবিরে যান, সেই বিধায়কদের তালিকায় ছিলেন সাবিনা। ঋতব্রত তৃণমূলে তাঁকে রাজ্য মহিলা শাখার সভাপতির পদ দেওয়া হয়েছিল। বুধবার সেই পদই ছেড়ে দিলেন সাবিনা। একটি টেলিফোনিক বার্তায় সাবিনা ইয়াসমিনের দাবি, ‘‘ঋতব্রত তৃণমূল বলে কিছু নেই। তৃণমূল কংগ্রেসে আমাকে রাজ্য মহিলা শাখার সভাপতি করা হয়েছিল । আমি পদ ছেড়ে দিলাম। এই দায়িত্ব সামলাতে হলে আমাকে গোটা রাজ্য চষে বেড়াতে হবে। বর্তমানে আমার যে শারীরিক এবং পারিবারিক পরিস্থিতি, তাতে এই দায়িত্বভার সামলানো সম্ভব হচ্ছে না। অহেতুক পদ ধরে রেখে তো লাভ নেই!’’
সাবিনা জানিয়েছেন,হোয়াট্সঅ্যাপ করে ঋতব্রত তৃণমূলের রাজ্য সভাপতিকে ইস্তফাপত্র পাঠিয়েছেন। এই পর্যন্ত তো সবই ঠিক আছে। শারীরিক সমস্যা হতেই পারে। কিন্তু সাবিনার পদ ছাড়া অন্য গন্ধ পাচ্ছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবির থেকে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবিরে যাওয়ায় ১০ বিধায়কের সদস্যপদ খারিজের জন্য সুপ্রিম কোর্টে যায় মমতা সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস। পাশাপাশি দলের তরফে বিধানসভার অধ্যক্ষের কাছেও লিখিতভাবে একই আবেদন জানান বিধায়ক শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়। সেই আবেদনের প্রেক্ষিতে যে ১০ জন বিধায়কের কাছে বিধানসভার সচিবালয়ের নোটিস পৌঁছয় সেই তালিকায় রয়েছে মোথাবাড়ির বিধায়ক সাবিনা ইয়াসমিনের নাম। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কিছুদিন আগেও ঋত শিবিরে চলে যাওয়া বিধায়কদের ১৫ দিন সময় দিয়েছিলেন। কালীঘাট তৃণমূলের তরফ থেকে বারবার দাবিও করা হয়েছে, ঋত শিবির থেকে অনেকেই ফেরত আসতে চাইছেন। এর আগে আমডাঙার বিধায়ক কাশেম সিদ্দিকি, বসিরহাট উত্তরের বিধায়ক তৌসিফ রহমান মমতা শিবিরে ফিরে এসেছেন। তাঁরা দাবি করেছিলেন, ভুল বুঝিয়ে তাঁদের নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। তবে কি ঘরে বাইরে চাপ বাড়ছে সাবিনা ইয়াসমিনের। কঠিন সময়ে জিতেই নিস্তার নেই তাঁর। অন্যদিকে ঋতব্রত শিবিরে চলছে ভাঙন পর্ব।

রাজনীতিতে সাবিনা ইয়াসমিনের উত্থান শুরু হয় কংগ্রেসের হাত ধরে। প্রথমে জেলা পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়ে পরে সভাধিপতির দায়িত্ব সামলান। এরপর মোথাবাড়ি বিধানসভা কেন্দ্র থেকে কংগ্রেসের বিধায়ক হন। নতুন আসন গঠনের পর টানা তিনবার বিধায়ক হিসেবে নির্বাচিত হন তিনি। ২০১১ ও ২০১৬ সালে কংগ্রেসের টিকিটে জয়লাভের পর ২০১৮ সালে তৃণমূল কংগ্রেসে যোগ দেন। ২০২১ সালে তৃণমূলের প্রার্থী হিসেবে জয়ী হয়ে ফের বিধায়ক হন। তৃণমূল সরকারের আমলে তিনি রাজ্যের সেচ ও জলসম্পদ এবং উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন দফতরের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ২৬ শের বিধানসভা নির্বাচনে মোথাবাড়ি নয় সুজাপুর কেন্দ্রে প্রার্থী করা হয়েছিল সাবিনা ইয়াসমিনকে। শোনা যায় মোথাবাড়িতে সাবিনা ইয়াসমিনে বিরুদ্ধে দলের অন্দরেই নাকি ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল। তাই তাঁকে সুজাপুরের প্রার্থী করা হয়। লড়াই করে তিনি জয়ও পান। কিন্তু হলে কী হবে তিনি জয় পান কিন্তু ক্ষমতাচ্যুত হয় তৃণমূল কংগ্রেস। এরপরই ইকুয়েশন বদলে যায়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত ছেড়ে ঋতব্রত শিবিরে যোগ দেন তিনি। এবার সেই শিবিরেই গুরুত্বপূর্ণ পদ ছাড়লেন সাবিনা। মালদা জেলায় জোর কানাঘুষো, এবার মনে হয় ঘরে ফিরতে চলেছেন সাবিনা। অর্থাৎ কংগ্রেসে ঘরের ফিরতে চলেছে সাবিনা ইয়াসমিন। এমনটাই চর্চা মালদাজুড়ে।