রিয়া দাস, সাংবাদিক: মুস্তাফিজুর রহমানকে দল থেকে বাদ দেওয়ার ঘোষণার পর থেকেই বাংলাদেশের ক্রিকেট মহলে যেন চর্চার শেষ নেই। একের পর এক সিদ্ধান্ত, বৈঠক আর জল্পনায় উত্তাল হয়ে উঠেছে বাংলাদেশের ক্রিকেটের আঙিনা। শুধু দল নির্বাচন নয়, তার সঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছে নিরাপত্তা, ভেন্যু ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির নানা সমীকরণ। মুস্তাফিজকে বাদ দেওয়া যে নিছক ক্রিকেটীয় সিদ্ধান্তের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, তা ক্রমশ স্পষ্ট হয়েছে। এই ঘটনার পর থেকেই টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ঘিরে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের অবস্থান। আইসিসির সঙ্গে তাদের আলোচনা ও ভারতের মাটিতে খেলতে যাওয়া নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ। সব মিলিয়ে পরিস্থিতি আরও জটিল আকার নিয়েছে।
এক দিকে দলের অন্যতম অভিজ্ঞ পেসারকে বাইরে রেখে নির্বাচকদের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অন্যদিকে ভারতের মাটিতে বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের নিরাপত্তা নিয়ে বিসিবির উদ্বেগও সামনে আসছে। এরই মাঝে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ঘিরে দক্ষিণ এশিয়ার ক্রিকেটে নতুন করে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তার আবহ। মাঠের লড়াই শুরুর আগেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে বাংলাদেশ দলের অংশগ্রহণ ও তাদের ম্যাচ অলোজনের ভেন্যু। প্রশ্ন উঠছে, শেষ পর্যন্ত কি ভারতেই টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলতে আসতে হবে বাংলাদেশকে? যাতে ভারতের মাটিতে খেলতে না হয় সেই লক্ষ্যেই মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড তথা বিসিবি। শনিবার আইসিসির সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে বসে তারা গ্রুপ বদলের প্রস্তাব পর্যন্ত দিয়েছে। তবে আপাতত সেই প্রস্তাবে সাড়া মেলেনি বলেই জানা যাচ্ছে। সূত্রের খবর, বর্তমান পরিস্থিতিতে আইসিসি বিশ্বকাপের গ্রুপ বিন্যাস ও সূচি বদলানোর কথা ভাবছে না।

ক্রিকেট বিষয়ক ওয়েবসাইটের এক প্রতিবেদনে এই তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। ওই প্রতিবেদনে আয়ারল্যান্ড ক্রিকেট বোর্ডের এখ আধিকারিকের উদ্ধৃতি দিয়ে জানানো হয়েছে, আইসিসি তাদের স্পষ্ট ভাবে জানিয়েছে যে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের সূচিতে কোনও পরিবর্তন করা হবে না। ওই আধিকারিকের কথায়, আয়ারল্যান্ড গ্রুপ পর্বের সব ম্যাচ শ্রীলঙ্কাতেই খেলবে, যেমনটা আগে নির্ধারিত ছিল। যদিও এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত আইসিসির তরফে আনুষ্ঠানিক ভাবে কোনও বিবৃতি দেওয়া হয়নি। তবু ক্রিকেট মহলে এই খবর যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। শনিবার আইসিসির প্রতিনিধিদের সঙ্গে বিসিবি কর্তাদের যে বৈঠক হয় তার পরেই একটি বিস্তারিত বিবৃতি প্রকাশ করে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড। সেই বিবৃতিতে বিসিবি জানায়, তারা আইসিসির কাছে আনুষ্ঠানিক ভাবে অনুরোধ করেছে যাতে বাংলাদেশের ম্যাচগুলি ভারতের পরিবর্তে শ্রীলঙ্কায় আয়োজন করা হয়। বিসিবির উদ্বেগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ক্রিকেটারদের নিরাপত্তা। পাশাপাশি বাংলাদেশি সমর্থক এবং সংবাদমাধ্যমের কর্মীদের নিরাপত্তা নিয়েও বোর্ড চিন্তিত বলে জানানো হয়েছে। বিবৃতিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, আলোচনার সময় সকল পক্ষই সমস্যার সমাধানে আগ্রহী বলে মত প্রকাশ করেছে। সেই সঙ্গে বিসিবি প্রস্তাব দেয় প্রয়োজনে বাংলাদেশকে অন্য একটি গ্রুপে সরিয়ে নেওয়া হোক, যাতে শ্রীলঙ্কাতেই তাদের সব ম্যাচ আয়োজন করা সম্ভব হয়। বিসিবির মতে, তাতে শুধু নিরাপত্তার দিক থেকেই নয়, ক্রিকেট সরঞ্জাম পরিবহণের ক্ষেত্রেও সুবিধা হবে।
এই বৈঠকের গুরুত্ব আরও বেড়ে যায় কারণ, শনিবার ঢাকায় গিয়ে বিসিবির সঙ্গে সরাসরি আলোচনায় বসেন আইসিসির ইন্টিগ্রিটি ইউনিটের জেনারেল ম্যানেজার অ্যান্ড্রু এফগ্রেভ। পাশাপাশি অনলাইনে বৈঠকে যোগ দেন আইসিসির ইভেন্টস অ্যান্ড কর্পোরেট কমিউনিকেশনস বিভাগের জেনারেল ম্যানেজার গৌরব সাক্সেনাও। যদিও প্রত্যাশিত সময়ে ভিসা না পাওয়ায় তিনি সরাসরি ঢাকায় উপস্থিত থাকতে পারেননি। বিসিবির পক্ষে বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন বোর্ড সভাপতি আমিনুল ইসলাম, সহ-সভাপতি মহম্মদ সাখাওয়াত হোসেন ও ফারুক আহমেদ, পরিচালক ও ক্রিকেট অপারেশনস কমিটির চেয়ারম্যান নাজমুল আবেদীন ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নিজামউদ্দিন চৌধুরী। সেখানেই নিজেদের উদ্বেগ ও প্রস্তাব বিস্তারিত ভাবে তুলে ধরে বিসিবি।
বর্তমানে সূচি অনুযায়ী টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে গ্রুপ সিতে রয়েছে বাংলাদেশ। এই গ্রুপে তাদের সঙ্গে আছে ইংল্যান্ড, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, নেপাল ও ইতালি। তবে বিসিবির প্রস্তাব, বাংলাদেশকে গ্রুপ বি-তে পাঠানো হোক এবং সেখানে আয়ারল্যান্ডের সঙ্গে জায়গা বদল করা হোক। যদি তা হয় তবে নতুন গ্রুপে বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ হবে অস্ট্রেলিয়া, শ্রীলঙ্কা, জিম্বাবোয়ে ও ওমান। উল্লেখযোগ্য বিষয়, আয়ারল্যান্ডের গ্রুপ পর্বের সব ম্যাচেই শ্রীলঙ্কার নির্ধারিত। ফলে বাংলাদেশ এই গ্রুপে গেলে তাদেরও ভারতের পরিবর্তে শ্রীলঙ্কায় খেলতে সুবিধা হবে। এই কারণটিই বিসিবির প্রস্তাবের নেপথ্যে অন্যতম বড় যুক্তি বলে মনে করা হচ্ছে। জানা গিয়েছে, আগামী সপ্তাহে এই বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাতে পারে বিশ্ব ক্রিকেটের নিয়ামক সংস্থা আইসিসি।
তবে ক্রিকেটবিষয়ক ওয়েবসাইটের রিপোর্ট অনুযায়ী, আইসিসি যদি শেষ পর্যন্ত গ্রুপ বদলের প্রস্তাবে সাড়া না দেয়, তা হলে নির্ধারিত সূচি মেনেই খেলতে হবে বাংলাদেশকে। সেক্ষেত্রে গ্রুপ পর্বে বাংলাদেশের চারটি ম্যাচের মধ্যে তিনটিই অনুষ্ঠিত হবে কলকাতার ইডেন গার্ডেন্সে আর একটি ম্যাচ হবে মুম্বইয়ের ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে। এখন দেখার বিষয়, নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক টানাপড়েনের এই আবহে আইসিসি শেষ পর্যন্ত কোন পথে হাঁটে ও বাংলাদেশের বিশ্বকাপ যাত্রা কোন মঞ্চে শুরু হয়।