রণজিৎ রায় ও ছোটন সেনগুপ্ত, নিজস্ব সংবাদদাতা : কয়লা পাচার, গরু পাচারের ঘটনা দেখেছেন বা শুনেছেন তো আগেই। এবার আরও এক পাচারের ছবি। এও ভিনরাজ্যে পাচারের ছবিই উঠে এসেছে। কিন্তু কী পাচার হচ্ছে ভিনরাজ্যে? যা শুনলে আপনি আঁটকে উঠবেন। আর যদি আপনার বাড়িতে কোনও রোগী থাকে, বিশেষ করে যদি থ্যালাসেমিয়া রোগী থাকে, তাহলে তো আরও আতঙ্কিত হয়ে যাবেন। জানেন কী পাচার হচ্ছে ভিনরাজ্যে ? আর এই ব়্যাকেটের পিছনে কে রয়েছে? কে সবার আড়ালে বসে, মানে মেঘনাদের মতো নাড়ছিল গোটা কলকাঠি? এবার গোটা কর্মকাণ্ডে পড়ল জল। চলল অভিযান। কলকাতা দিয়েই প্রথম অভিযান শুরু হয়। জেলাতেও চলে অভিযান। তালিকায় যোগ হয় কলকাতা, হাওড়া, নদিয়া, দুর্গাপুর, পূর্ব বর্ধমানের মতো গুরুত্বপূর্ণ জেলা। কোথাও সকাল থেকে রাত পর্যন্ত টানা চলে অভিযান। আবার কোথাও সকালেই চলে অভিযান।

কয়লা, বালি, গরু পাচারের অভিযোগের পর এবার সামনে এল আরও এক চাঞ্চল্যকর অভিযোগ। কোটি কোটি টাকার বিনিময়ে ভিনরাজ্যে পাচারের অভিযোগ। স্বাস্থ্য দফতরকে অন্ধকারে রেখে চলছিল গোটা চক্র। সেই অভিযোগের ভিত্তিতেই কলকাতা, হাওড়া, নদিয়া, দুর্গাপুর, পূর্ব বর্ধমান-সহ রাজ্যের একাধিক ব্লাড ব্যাঙ্ক ও বেসরকারি হাসপাতালে একযোগে অভিযান চালায় স্বাস্থ্য দফতর। তদন্তে কী উঠে এল, তা নিয়েই শুরু তীব্র চর্চা।
এবার আসা যাক কী পাচার হচ্ছিল… সেই প্রসঙ্গে। যাদের বাড়িতে রোগী রয়েছে, হাসপাতালে গিয়ে তাঁদের একাংশের শুনতে হয়েছে ব্লাড ব্যাঙ্কে রক্ত নেই। কিন্তু এই যে জেলায় জেলায় এত রক্তদান শিবিরের আয়োজন করা হয়। সেই রক্ত যাচ্ছে কোথায়? এমন প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে বেরিয়ে এল বিশাল দুর্নীতির ছবি। মানে কেঁচো খুড়তে গিয়ে বেরিয়ে পড়ল কেউটে। রক্ত-প্লাজমা বাংলা থেকে ভিনরাজ্যে পাচারের অভিযোগ। এবার বাংলার একাধিক জায়গায় অভিযান রাজ্য স্বাস্থ্য দপ্তরের। কোটি টাকার বিনিময়ে এই রক্ত-প্লাজমা বাইরে পাচার হচ্ছে বলে অভিযোগ। বহু ক্ষেত্রেই রক্ত সংকট যাতে না হয়, সেজন্য বাংলার বিভিন্ন জায়গায় রক্তদান শিবির অনুষ্ঠিত হয়। অনেক ক্ষেত্রেই ওইসব রক্তের বহু ইউনিট বাইরে চলে যায় বলেও অভিযোগ।
স্বাস্থ্য ভবনের নির্দেশে মঙ্গলবার হাওড়ার বেসরকারি ব্লাড ব্যাংকে আচমকা অভিযান চালায় জেলা স্বাস্থ্য দপ্তর। অভিযোগ, ওই ব্লাড ব্যাংক থেকে বিগত কয়েক মাসে রক্তদান শিবিরের নাম করে সংগ্রহ করা হয় প্রায় দশ হাজার ইউনিট রক্ত এবং প্লাজমা । যা বেআইনিভাবে ভিন রাজ্যে পাচার করা হয়। স্বাস্থ্য ভবনে জমা পড়া একটি গোপন রিপোর্টের ভিত্তিতেই এই অভিযান। অভিযোগ উঠেছে, জেলার বিভিন্ন জায়গায় সংস্থাটি রক্তদান শিবির আয়োজন করত। সেই শিবির থেকে সংগ্রহ হওয়া রক্ত স্থানীয় প্রয়োজনে ব্যবহার না করে চড়া দামে অন্য রাজ্যের বেসরকারি হাসপাতাল এবং ডিলারদের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হত। স্টক রেজিস্টার, ডোনার লিস্ট এবং ডিসপ্যাচ রেকর্ড খতিয়ে দেখে প্রাথমিকভাবে প্রায় ১০,০০০ ইউনিট রক্ত ও প্লাজমার হিসাব না মেলার বিষয়টি সামনে আসে। এত বড় পরিমাণ রক্ত জেলার বাইরে চলে যাওয়ায় রোগীদের চিকিৎসা পরিষেবা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়। স্বাস্থ্য ভবনের নির্দেশ মেনেই তল্লাশি চালানো হয়। প্রাথমিক তদন্তে রক্ত পাচারের শক্তিশালী প্রমাণ মেলে। ব্লাড ব্যাংকের লাইসেন্স, স্টোরেজের তাপমাত্রা এবং কাগজপত্রের বড়সড় গরমিল পাওয়া যায়। পুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখে রিপোর্ট স্বাস্থ্য ভবনে পাঠানো হবে। দোষী প্রমাণিত হলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এই ঘটনার জেরে রাজ্যের বেসরকারি ব্লাড ব্যাংকগুলির ওপর নজরদারি আরও বাড়ানোর ইঙ্গিত দিয়েছে স্বাস্থ্য ভবন।
কয়লা, বালি পাচারের পর এবার রক্ত পাচারেরও ছবি সামনে এল। যদিও বিজেপি সরকার আসায় এই দুর্নীতি সামনে এসেছে বলে মনে করেন নগরোন্নয়ন প্রতিমন্ত্রী উমেশ রাই।
হাওড়ার পাশাপাশি স্বাস্থ্য দপ্তরের অভিযান চলে দুর্গাপুরে বেসরকারি হাসপাতালের ব্লাড ব্যাঙ্কে । রাজ্যজুড়ে ব্লাড ব্যাঙ্কগুলির কার্যকলাপ ও রক্ত সংরক্ষণ সংক্রান্ত নথিপত্র যাচাই করতে জোরদার অভিযান শুরু রাজ্য স্বাস্থ্য দপ্তরের। মঙ্গলবার সকাল থেকে দুর্গাপুরের অন্ডাল এলাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালের ব্লাড ব্যাঙ্কে পৌঁছায় স্বাস্থ্য দপ্তরের বিশেষ তদন্তকারী দল। সকাল থেকেই ব্লাড ব্যাঙ্কের বিভিন্ন নথি খুঁটিয়ে পরীক্ষা করা হয়। ব্লাড ব্যাঙ্কের লাইসেন্স, রক্ত সংগ্রহ ও বিতরণের রেকর্ড, রক্ত সংরক্ষণের পদ্ধতি, স্টক রেজিস্টার এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি নির্দেশিকা যথাযথভাবে মানা হচ্ছে কি না, তা বিস্তারিতভাবে খতিয়ে দেখা হয়। তদন্তকারী দল হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ নথিও সংগ্রহ করে।
স্বাস্থ্য পরিষেবার মতো স্পর্শকাতর ক্ষেত্রকে ঘিরে ওঠা এই অভিযোগে স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগ বাড়ছে। মানুষের স্বেচ্ছায় দান করা রক্ত যদি সত্যিই নিয়ম ভেঙে ভিনরাজ্যে পাচার হয়ে থাকে, তবে তা শুধু আইনের লঙ্ঘন নয়, রোগীদের জীবন নিয়েও চরম ছিনিমিনি খেলার সামিল। তদন্তে শেষ পর্যন্ত কী তথ্য সামনে আসে, কারা এই চক্রের সঙ্গে জড়িত এবং দোষীদের বিরুদ্ধে কতটা কড়া পদক্ষেপ নেওয়া হয়, এখন সেদিকেই নজর গোটা রাজ্যের।