বিশ্বজিৎ নস্কর, নিজস্ব সংবাদদাতা : বন্যপ্রাণী ও পাখি পাচারের অভিযোগে গ্রেফতার পল্লব ভারতীকে বৃহস্পতিবার আদালতে পেশ করল পুলিশ। তদন্তের স্বার্থে অভিযুক্তকে ১৪ দিনের পুলিশ হেফাজতে নেওয়ার আবেদন জানানো হয়েছে। আদালতে যাওয়ার পথে নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করে পল্লব ভারতীর দাবি, তাঁকে ‘ফাঁসানো’ হয়েছে। তাঁর বক্তব্য, চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যানের সঙ্গে বন দফতরের যোগাযোগ ছিল এবং তিনি শুধুমাত্র একজন কর্মচারী হিসেবে তাঁদের নির্দেশ মেনেছেন।

আদালতে যাওয়ার আগে পল্লব ভারতী দাবি করেন, “চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান আমাকে ফাঁসিয়েছে। ভাইস চেয়ারম্যান নিজেই বন দফতরের সঙ্গে কথা বলেছিল। আমি ফোন নম্বর দিয়েছিলাম। সবকিছু ওরা জানত। আমরা কর্মচারী।” তাঁর এই বক্তব্য ঘিরে নতুন করে চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে।
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, পাখি আটকে রাখা এবং বন্যপ্রাণী পাচারের অভিযোগের তদন্তে পল্লব ভারতীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। অভিযোগ, অবৈধভাবে একাধিক পাখি আটকে রাখা এবং সেগুলিকে পাচারের সঙ্গে যোগ থাকতে পারে অভিযুক্তের। সেই সূত্রেই তদন্তকারীরা তাঁর ভূমিকা খতিয়ে দেখছেন।
ঘটনার তদন্তে বন দফতরের ভূমিকা এবং স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়টিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানা গিয়েছে। পল্লব ভারতীর বক্তব্য অনুযায়ী, ভাইস চেয়ারম্যান নিজেই বন দফতরের আধিকারিকদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন এবং তিনি সেই যোগাযোগের জন্য প্রয়োজনীয় ফোন নম্বর দিয়েছিলেন। তবে অভিযুক্তের এই দাবি তদন্তকারীদের কাছে কতটা গুরুত্বপূর্ণ, সে বিষয়ে এখনও পুলিশের পক্ষ থেকে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি।
অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে পাখি আটকে রাখা এবং বন্যপ্রাণী পাচার। বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ সংক্রান্ত আইনে সুরক্ষিত বন্যপ্রাণী ও নির্দিষ্ট বন্যপ্রাণী প্রজাতি সংক্রান্ত বেআইনি শিকার, দখল, বেচাকেনা বা বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণের বিধান রয়েছে। তদন্তকারীরা উদ্ধার হওয়া পাখিগুলির প্রজাতি, সেগুলি কোথা থেকে আনা হয়েছিল এবং কোথায় পাচারের পরিকল্পনা ছিল—সমস্ত বিষয় খতিয়ে দেখছেন।
পুলিশের হাতে থাকা অভিযোগ ও প্রাথমিক তথ্যের ভিত্তিতে মামলায় Wild Life (Protection) Act, 1972-এর ধারাও যুক্ত করা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। ওই আইনের ৫০ নম্বর ধারায় নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে বন্যপ্রাণী, বন্যপ্রাণীজাত সামগ্রী ইত্যাদি জব্দ করা এবং যুক্তিসঙ্গত সন্দেহ থাকলে অভিযুক্তকে গ্রেফতার করার ক্ষমতার কথা বলা হয়েছে।
এদিকে, আদালতে পেশের সময় পল্লব ভারতীর বক্তব্য মামলাটিকে অন্য মাত্রা দিয়েছে। তিনি কার্যত দাবি করেছেন, পুরো বিষয়টি সম্পর্কে চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যান অবগত ছিলেন। শুধু তাই নয়, বন দফতরের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রেও ভাইস চেয়ারম্যানের সক্রিয় ভূমিকা ছিল বলে তাঁর দাবি। ফলে তদন্তে এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে—কার নির্দেশে পাখি রাখা হয়েছিল, বন দফতরের সঙ্গে কে যোগাযোগ করেছিলেন এবং অভিযুক্তের আসল ভূমিকা কী ছিল।
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, তদন্তের স্বার্থে পল্লব ভারতীকে নিজেদের হেফাজতে নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। পাখি কোথা থেকে এসেছিল, কোথায় পাঠানোর কথা ছিল, এই ঘটনায় আরও কেউ জড়িত কি না এবং গোটা চক্রের সঙ্গে অভিযুক্তের কোনও যোগ রয়েছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই ১৪ দিনের পুলিশ হেফাজত চাওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে, পল্লব ভারতীর অভিযোগ সত্যি কি না, চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যানের ভূমিকা ছিল কি না, কিংবা অভিযুক্ত নিজে শুধুমাত্র কর্মচারী হিসেবেই কাজ করেছেন কি না—তা তদন্তেই স্পষ্ট হবে। পুলিশের তদন্ত এবং আদালতের বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোনও পক্ষের অভিযোগকেই চূড়ান্ত সত্য হিসেবে বিবেচনা করা যাচ্ছে না।
এখন তদন্তকারীদের নজর উদ্ধার হওয়া পাখি, বন দফতরের সঙ্গে যোগাযোগের নথি, ফোন কলের তথ্য এবং মামলায় আরও কারও যোগ রয়েছে কি না—সেই দিকেই। পল্লব ভারতীর ‘ফাঁসানো হয়েছে’ দাবি এবং ১৪ দিনের পুলিশ হেফাজতের আবেদন ঘিরে মামলায় তদন্ত কোন দিকে মোড় নেয়, সেদিকেই নজর রয়েছে।