সায়ন্তিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, সাংবাদিক: ডিসেম্বরের শেষ থেকেই ইরান উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল। এক ইস্যু নিয়ে শুরু হওয়া আন্দোলন পরিণত হয়ে যায় খামেনেইকে উৎখাত করার আন্দোলনে। ক্রমশই রাজপথে বাড়তে থাকে প্রতিবাদীদের ভিড়। বিক্ষোভের সূত্রপাত গত ২৭ ডিসেম্বর। ওই দিন তেহরানের দোকানিরা প্রথম মুদ্রাস্ফীতি এবং মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করেন। ক্রমে দেশের অন্যান্য প্রান্তেও ছড়িয়ে পড়ে বিক্ষোভের আঁচ। লোর্ডেগান, কুহদাশত এবং ইসফাহান-সহ একাধিক জায়গা থেকে বিক্ষোভকারীদের মৃত্যুর খবর আসতে শুরু করে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়ারা তেহরানের রাস্তায় নেমে পড়েন।

স্লোগান ওঠে, ‘স্বৈরশাসন নিপাত যাক’। ১৯৭৯ সালের ইসলামিক বিপ্লবের সময় ক্ষমতাচ্যুত শাসক শাহ মহম্মদ রেজ়া পাহলভির পুত্রর সমর্থনেও স্লোগান ওঠে— ‘শাহ দীর্ঘজীবী হোন’। আন্দোলন কার্যত দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়, ইরান প্রশাসন চেয়েছিল যত দ্রুত এবং যেন তেন প্রকারে সরকার বিরোধী কন্ঠগুলোকে দমন করতে আবার ট্রাম্প চেয়েছিলেন খামেনেইয়ের রাজত্বের অবসান, রেজা পেহলভির পুত্র তিনিও আন্দোলনকারীদের রাজপথ না ছাড়ার আহবান জানিয়েছিলেন তিনি আরও জানান যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজে এই আন্দোলনের দিকে নজর রাখছেন অন্যদিকে খামেনেই সরকারও চুপ ছিল না তাদের তরফে জানানো হয় যে যারা আন্দোলন করবে তাদের ঈশ্বরের শত্রু তকমা দিয়ে ম্রিত্যুদন্ড দেওয়া হবে এমনকী যারা আন্দোলনে সাহায্য করবে একই অবস্থা হবে তাদেরও।এরপরেই জানা গেল এরফান সোলতানি নামে এক খামেনেই বিরোধী যুবককে নাকি ফাঁসি দেওয়া হবে আর এই খবরে আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে পরিস্থিতি।
উল্লেখ্য গ্রেফতার হওয়ার পর সোলতানির সমস্ত আইনি অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়। তাঁর হয়ে কোনও আইনজীবীকে সওয়াল করতে দেওয়া হয়নি। মামলার খুঁটিনাটির বিষয়ে ওই যুবকের পরিবারকেও অন্ধকারে রাখা হয় বলে অভিযোগ। কিন্তু লাগাতার চাপ বাড়তে থাকে ইরানের ওপর আর তার পরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের লাগাতার হুমকির মুখে নতিস্বীকার করতে বাধ্য হয় ইরান। । সরকারবিরোধী আন্দোলনে অংশ নেওয়া ওই যুবকের মৃত্যুদণ্ড স্থগিত করেছে ইরান। ইরানের বিচারবিভাগ বলেছে, সোলতানির বিরুদ্ধে ইসলামি ব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও প্রচারের অভিযোগ আনা হয়েছিল। যা দেশের নিরাপত্তার বিরুদ্ধে। বিচারক বলেছেন, এই অপরাধে কারও মৃত্যুদণ্ডের বিধান নেই। আইনানুসারে তাঁর জেল হতে পারে। কিন্তু এই ধরনের অপরাধে মৃত্যুদণ্ড হয় না।
এর পাশাপাশি আরও প্রায় ৮০০র কাছাকাছি মৃত্যুদন্ড হওয়ার কথা ছিল বৃহস্পতিবার কিন্তু সেই সমস্ত মৃত্যু দন্ড রদ করে দেয় ইরান আর তারপরেই আচমকা ট্রাম্পের ভোলবদল। ইরানে সামরিক অভিযান করতে পারে আমেরিকার বাহিনী, একাধিক বার তা নিয়ে সতর্ক করেছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। নিজে প্রকাশ্যেই সেই অভিযানের সম্ভাবনার কথা ঘোষণা করেছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমেরিকা সেই পরিকল্পনা থেকে সরে এসেছে। ইরান সম্বন্ধে সুর কিছুটা নরম করেছেন ট্রাম্প। ট্রাম্পের মুখে শোনা গিয়েছে ইরানের প্রশংসা, যা অতি দুর্লভ। ট্রাম্প জানিয়ে দিলেন, সরকারবিরোধী আন্দোলনে নামা আটশোর বেশি বিদ্রোহীর মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করেও পিছিয়ে এসেছে তেহরান। এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন ট্রাম্প। ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লিভিট বলেন, আমাদের প্রেসিডেন্টের কাছে খবর এসেছে যে, ইরান ৮০০ জন বিক্ষোভকারীর ফাঁসির দণ্ড কার্যকর করা স্থগিত করেছে। এই বিক্ষোভকারীদের বুধবার ফাঁসি হওয়ার কথা ছিল। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় অঞ্চলের মিত্রদের চাপের জেরে ইরানে ক্ষমতাসীন ইসলামি প্রজাতন্ত্রী সরকার এই পদক্ষেপ নিয়েছে বলে ব্রিফিংয়ে জানিয়েছেন তিনি। তবে ফাঁসির বিষয়টি অস্বীকার করেছে ইরান। তারা জানিয়েছে, এই বিক্ষোভের জেরে কাউকে ফাঁসি দেওয়ার কোনো পরিকল্পনাই তাদের ছিল না। এই কথা জানিয়েছেন খোদ ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। তিনি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তেহরানের অবস্থান পরিষ্কার করে বলেছেন, বিক্ষোভের ঘটনায় কোনো ব্যক্তিকে ফাঁসি দেওয়ার কোনো ইচ্ছে বা পরিকল্পনাই তাদের সরকারের নেই। শুধু তাই নয়, তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, ফাঁসির মতো কোনো শাস্তি দেওয়ার বিষয়টি বর্তমানে তাঁদের ভাবনার বাইরে। ট্রাম্পের এই ধন্যবাদ বার্তার মধ্য়েই বড় ইঙ্গিত খুঁজে পাচ্ছেন কূটনীতিকরা। ইরানের উপরে সরাসরি মার্কিন হামলার যে আশঙ্কা করা হচ্ছিল, তা অনেকটাই কমল বলেই মনে করছেন তারা। তবে ইরানের পরিস্থিতি যেহেতু জটিল এবং ট্রাম্প নিজের মর্জি মতো কাজ করেন, তাই আগামিদিনে কী হয়, তা এখনই বলা যাচ্ছে না। আর সেটাই তো হল, ফের খামেনেইকে উৎখাতের ডাক ট্রাম্পের। ইতিমধ্যেই সৌদি আরব ও কাতার মার্কিন বাহিনীকে হুঁশিয়ারি দিয়েছে যে ইরানে আক্রমণ করলে, তার চরম মূল্য চোকাতে হবে। ইজরায়েল, যারা আমেরিকার পাশেই থাকে, তারাও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। চলতি সপ্তাহের শুরুতেও ইরান নিয়ে কঠোর বার্তা দিচ্ছিলেন ট্রাম্প। দাবি করছিলেন, ইরানে সামরিক অভিযান চালানো ছাড়া আমেরিকার আর উপায় নেই। এ বিষয়ে হোয়াইট হাউসে দফায় দফায় বৈঠক চলেছে। ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতোল্লা আলি খামেনেইও ট্রাম্পের সমালোচনা করেছিলেন প্রকাশ্যে। তবে সৌদি আরব, মিশর, কাতার এবং ওমানের মধ্যস্থতাতেই ইরান এবং আমেরিকার উত্তেজনা কিছুটা প্রশমিত হয়েছে। প্রত্যেকেই ট্রাম্পকে বুঝিয়েছেন, ইরানের উপর এই মুহূর্তে যে কোনও হামলা আঞ্চলিক অশান্তি বৃদ্ধি করবে, নিরাপত্তা বিঘ্নিত করবে এবং তাতে আখেরে আমেরিকারই ক্ষতি হবে। আবার ইরানকে এই চার দেশের প্রতিনিধি বুঝিয়েছেন, আরব উপসাগরীয় এলাকায় থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলিতে যে কোনও ধরনের হামলা ওই অঞ্চলের অন্যান্য দেশের সঙ্গে ইরানের সম্পর্কের অবনতি ঘটাবে। কিন্তু তিনি তো ডোনাল্ড ট্রাম্প কখন কি করবেন তা বোধহয় তিনি নিজেও জানেন না আর তাই হয়ত ইরানকে ধন্যবাদ দেওয়ার পরেও আবার ভোলবদল প্রেসিডেন্টের। ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা খামেনেই শনিবার সমাজমাধ্যমে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে কয়েকটি পোস্ট করেন। সরব হন পশ্চিম এশিয়ায় আমেরিকার আগ্রাসন নিয়ে। খামেনেইয়ের দাবি, ইরানে এই ক্ষয়ক্ষতি এবং হত্যালীলার জন্য ট্রাম্প প্রশাসনই দায়ী। কয়েকটি হিংস্র গোষ্ঠীকে ইরানের জনগণের প্রতিনিধি হিসাবে তুলে ধরছে আমেরিকা। একে ‘ভয়াবহ অপবাদ’ বলেও তিনি উল্লেখ করেছেন। তাঁর কথায়, ‘‘আমরা দেশকে যুদ্ধের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাব না। তবে আমরা দেশের অভ্যন্তরীণ এবং আন্তর্জাতিক অপরাধীদের শাস্তি না-দিয়ে ছেড়েও দেব না। ইরানে এই মৃত্যু, ধ্বংস এবং অপবাদের জন্য আমরা আমেরিকার প্রেসিডেন্টকে অপরাধী বলে মনে করি।’’ট্রাম্প বলেন, “ইরানে এখন নতুন নেতৃত্ব খোঁজার সময় এসেছে। খামেনেই দোষী। ইরানকে ধ্বংস করতে তিনি বদ্ধপরিকর। দেশে যেভাবে তিনি হিংসা ছড়াচ্ছেন, আগে এরকম দেখা যায়নি। হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। সময় এসেছে দেশে নেতৃত্ব বদলের।” ট্রাম্প আরও বলেন, “নেতৃত্বের মধ্যে শ্রদ্ধা থাকে। ভয় বা মৃত্যু নয়। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা শাসনের জন্য অযোগ্য। তিনি একজন অসুস্থ। তাঁর উচিত দেশকে সঠিকভাবে পরিচালনা করা এবং মানুষ হত্যা বন্ধ করা। দুর্বল নেতৃত্বের কারণে ইরান বসবাসের অযোগ্য। এরপর যে নতুন করে দুই দেশের সম্পর্কের আরও অবনতি হল তা বলাই বাহুল্য।