আরপ্লাস নিউজ ডিজিটাল ডেস্ক : বাংলার স্বাস্থ্যনীতিতে বড়সড় বদলের ইঙ্গিত। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সংঘাতের পর অবশেষে পশ্চিমবঙ্গে চালু হল কেন্দ্রীয় সরকারের আয়ুষ্মান ভারত প্রকল্প। আর ক্ষমতায় এসেই প্রথম মন্ত্রিসভার বৈঠকে সেই সিদ্ধান্তে সিলমোহর দিল শুভেন্দু অধিকারীর সরকার। এতদিন রাজ্যে স্বাস্থ্যসাথীকেই হাতিয়ার করে সাধারণ মানুষের চিকিৎসার খরচ সামলানোর দাবি করেছিল তৃণমূল সরকার। কিন্তু এবার কেন্দ্রীয় প্রকল্প চালুর পর থেকেই উঠতে শুরু করেছে নতুন প্রশ্ন।

তাহলে কি ধীরে ধীরে গুরুত্ব হারাবে স্বাস্থ্যসাথী? ভোটের প্রচারে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, বিজেপি সরকার গঠন হলেই বাংলার মানুষ পাবেন আয়ুষ্মান ভারতের সুবিধা। সেই প্রতিশ্রুতি পূরণ হতেই এখন শুরু হয়েছে নতুন বিতর্ক। কারণ দুই প্রকল্পেই রয়েছে বছরে ৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত ক্যাশলেস চিকিৎসার সুবিধা। দুই ক্ষেত্রেই সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার সুযোগ রয়েছে। ফলে সাধারণ মানুষের একাংশের প্রশ্ন। দুটি প্রকল্প কি একসঙ্গে চলবে, নাকি একটির জায়গা নেবে অন্যটি? আর সেই জল্পনাই এখন রাজ্যের স্বাস্থ্য পরিষেবাকে ঘিরে তৈরি করেছে নতুন রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক। চলুন এক ঝলকে দেখে নেওয়া যাক, দুই প্রকল্পে কী রকম সুযোগ সুবিধা রয়েছে। মানুষের সুবিধার স্বার্থে কোনটা এগিয়ে, আর কোনটা পিছিয়ে?
প্রথমেই নজর দেওয়া যাক আয়ুষ্মান ভারত প্রকল্পের দিকে। কেন্দ্রীয় সরকারের আয়ুষ্মান ভারত প্রকল্পের অধীনে আর্থিকভাবে দুর্বল পরিবারগুলি বছরে সর্বোচ্চ ৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত বিনামূল্যে চিকিৎসার সুবিধা পাবে। দেশের বিভিন্ন সরকারি ও তালিকাভুক্ত বেসরকারি হাসপাতালে সম্পূর্ণ ক্যাশলেস চিকিৎসা করানো যাবে। হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার আগে তিন দিন এবং ছুটি পাওয়ার পর ১৫ দিন পর্যন্ত ওষুধ ও বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার খরচও এই প্রকল্পের আওতায় থাকবে। এছাড়া ক্যান্সার, হৃদরোগের অস্ত্রোপচার, কিডনি প্রতিস্থাপন, ব্রেন সার্জারির মতো প্রায় ১৯০০টিরও বেশি জটিল চিকিৎসা এই প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত। পরিবারে সদস্য সংখ্যার কোনও ঊর্ধ্বসীমা নেই। পাশাপাশি ৭০ বছরের বেশি বয়সি প্রবীণ নাগরিকদের জন্যও বছরে অতিরিক্ত ৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত স্বাস্থ্যবিমার সুবিধা রাখার কথা জানানো হয়। রোগীকে হাসপাতালে আনা-নেওয়ার জন্য নির্দিষ্ট যাতায়াত ভাতার ব্যবস্থাও রয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকারের নির্দেশিকা অনুযায়ী, এই প্রকল্পের সুবিধাভোগীদের একটি নির্দিষ্ট মানদণ্ড রয়েছে। যে সকল পরিবারের বার্ষিক আয় ২.৫ লক্ষ টাকার কম তাঁরা এই সুযোগ পাবে। যারা কাঁচা বাড়িতে বা এক কামরার ঘরে থাকেন, তাঁরা এই সুবিধা পাবেন। এছাড়া SC, ST এবং বিশেষভাবে সক্ষম ব্যক্তিরা অগ্রাধিকার পাবেন। তবে ব্যক্তিগত বিমা বা ইএসআই থাকলেও আয়ুষ্মান ভারতের সুবিধা পাওয়া সম্ভব। তবে কবে থেকে এতে আবেদন করা যাবে, তা স্পষ্ট করেনি রাজ্য প্রশাসন।
বাইটঃ শুভেন্দু অধিকারী
অন্যদিকে ২০১৬ সালে চালু হওয়া স্বাস্থ্য সাথী কার্ডের সুবিধাগুলো এক নজরে দেখে নেওয়া যাক। এই প্রকল্পেও প্রতিটি পরিবার বছরে ৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত ক্যাশলেস চিকিৎসার সুবিধা পেয়ে থাকে। সরকারি ও বেসরকারি তালিকাভুক্ত হাসপাতালে চিকিৎসার সম্পূর্ণ খরচ বহন করে রাজ্য সরকার। স্বাস্থ্যসাথীর আওতায় হাসপাতালে ভর্তি থাকাকালীন ওষুধ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, অপারেশন, এমনকি রোগীর খাবারের খরচও বহন করা হয়। পরিবারের নির্ভরশীল সদস্য, প্রবীণ বাবা-মা এবং সন্তানরাও এই প্রকল্পের সুবিধা পান। হাসপাতাল থেকে ছুটি পাওয়ার সময় রোগীদের যাতায়াত খরচ বাবদ এককালীন আর্থিক সহায়তাও দেওয়া হয়।
দুই প্রকল্পেই বছরে ৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত ক্যাশলেস চিকিৎসার সুবিধা থাকলেও, আয়ুষ্মান ভারত দেশের সর্বত্র ব্যবহারযোগ্য হওয়ায় তা জাতীয় স্তরে বেশি কার্যকর বলে মনে করছেন অনেকেই। আবার স্বাস্থ্যসাথীর ক্ষেত্রে রাজ্যের বহু হাসপাতালের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সমন্বয় থাকায় সাধারণ মানুষের কাছে সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এখন দেখার, দুই প্রকল্প একসঙ্গে চললে রাজ্যের স্বাস্থ্য পরিষেবায় কী প্রভাব পড়ে।
সরকার বদলেছে। আর তারপর থেকেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আমলের প্রকল্পগুলি ঘিরে তৈরি হয়েছে বিস্তর ধোঁয়াশা। তার মধ্যে অন্যতম হল স্বাস্থ্যসাথী। এখন প্রশ্ন হল, বর্তমানে পালাবদল পরবর্তী পরিস্থিতিতে কলকাতার নামী প্রাইভেট হাসপাতালগুলি কি স্বাস্থ্যসাথী কার্ড গ্রহণ করছে ? রাজ্যের স্বাস্থ্য দফতর সূত্রের খবর, স্বাস্থ্যসাথীর হেল্পলাইনে বহু মানুষ ফোন করে অভিযোগ জানাচ্ছেন, তাঁদের কার্ড গ্রহণ করছে না হাসপাতাল বা নার্সিংহোম। রোগীদের অভিযোগ, অনেক ক্ষেত্রেই তাঁরা ক্যাশলেস পরিষেবা পাচ্ছেন না। যেমন হাওড়া একটি বেসরকারি হাসপাতালে স্বাস্থ্যসাথী কার্ড নেওয়া হচ্ছে না বলে অভিযোগ। যদিও ওই বেসরকারি হাসপাতালের তরফে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানা যায়নি।
সরকার পরিবর্তনের পর থেকেই রাজ্যের একাধিক জনমুখী প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। সেই তালিকায় এখন সবচেয়ে বেশি আলোচনায় স্বাস্থ্যসাথী। সাধারণ মানুষের একাংশের আশঙ্কা, আয়ুষ্মান ভারত চালু হওয়ার পর ধীরে ধীরে গুরুত্ব হারাতে পারে রাজ্যের এই প্রকল্প। ইতিমধ্যেই বিভিন্ন জায়গা থেকে অভিযোগ উঠতে শুরু করেছে, কিছু বেসরকারি হাসপাতাল নাকি স্বাস্থ্যসাথী কার্ড নিতে অনীহা দেখাচ্ছে। যদিও সরকারি ভাবে এখনও স্বাস্থ্যসাথী বন্ধের কোনও ঘোষণা হয়নি। ফলে বিভ্রান্তি আরও বাড়ছে সাধারণ মানুষের মধ্যে। একদিকে কেন্দ্রের আয়ুষ্মান ভারত, অন্যদিকে রাজ্যের স্বাস্থ্যসাথী। দুই প্রকল্পই স্বাস্থ্য পরিষেবাকে সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে আনতে তৈরি হয়েছিল। কিন্তু এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, দুই প্রকল্প কি সমান্তরালভাবে চলবে, নাকি একসময় একটির জায়গা নেবে অন্যটি? কারণ চিকিৎসার খরচ যত বাড়ছে, ততই এই ধরনের স্বাস্থ্যবিমা প্রকল্পের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন সাধারণ মানুষ। তাই রাজনৈতিক তরজা ছাপিয়ে এখন মানুষের একটাই চাওয়া। চিকিৎসার সময়ে যেন কার্ড নয়, আগে গুরুত্ব পায় রোগীর জীবন।