জুলেখা নাসরিন, সাংবাদিক : সম্প্রতি, ইসকনকে বাংলাদেশে নিষিদ্ধ করার দাবিতে ঢাকা-সহ বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় প্রতিবাদ মিছিল করল জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ বা জামাত। জামাতের ডাকে এই মিছিল হলেও ব্যানার ছিল তৌহিদী জনতা নামে এক অরাজনৈতিক দলের। বাংলাদেশের একাধিক জায়গায় এই মিছিল দেখা যায়। বিক্ষোভকারীরা ইসকনের বিরুদ্ধে দেশজুড়ে হিংসা, হত্যা, হুমকি, অপহরণ এবং বিভিন্ন দেশবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ তোলেন।
এই তৌহিদী জনতা কারা। কি তাদের পরিচয়। তৌহিদী জনতা’ তথা বিক্ষুব্ধ কট্টর মুসলিমদের বোঝায়। এরা একাধিকবার বাংলাদেশের শান্তি নষ্ট করেছে। মূলত ৫ অগাস্টের পর থেকে অর্থাৎ হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকে এই তৌহিদী জনতার কার্যকলাপ ব্যাপক বৃদ্ধি পেয়েছে বাংলাদেশে। যদিও ইউনুস সরকারের বক্তব্য, দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশ প্রশাসন সজাগ দৃষ্টি রাখছে।

কিন্তু, তৌহিদী জনতার ব্যানারে বিক্ষোভ বাংলাদেশের সাধারণ মানুষকে বেশ অবাক করেছে। তবে ইসকন নেতাদের আশঙ্কা, এর পিছনে রয়েছে বড় রকমের চক্রান্ত। গুজব ছড়িয়ে কিছু অসাধু ব্যক্তি ও গোষ্ঠী বিভ্রান্তিকর বক্তব্যের মাধ্যমে ইসকনের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়িয়ে, বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা তৈরির ষড়যন্ত্র করছে। কিন্তু সত্যি যদি এই আশঙ্কা সত্যি হয়,তাহলে ঘোরতর বিপদ পদ্মাপাড়ে। এমনকি ইসকেন সদস্যদের প্রাণনাশের হুমকিও দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ। ইউনুস সরকারের কাছে ইসকন নেতাদের আবেদন, গুজব, মিথ্যা, অপপ্রচার ও হুমকির বিরুদ্ধে যেন সুষ্ঠু তদন্ত করা হয়। অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হয়। এছাড়া বাংলাদেশে নারী নিগ্রহ, খুন, ধর্ষণ,রাহাজানির ঘটনা ঘটছে অহরহ। ইউনুসের বাংলাদেশে নারী নির্যাতন দশগুন বেড়ে গিয়েছে। সংখ্যালঘুরাও আতঙ্কে সেখানে।
এবার হাসিনার মাস্টারস্ট্রোকের কথা বলি। নির্বাচন কমিশনকে এবার আড়াই চালের প্যাঁচে ফেললেন মুজীব কন্যা। কী প্যাঁচ। বাংলাদেশের পরবর্তী সাধারণ নির্বাচন বয়কট করবেন আওয়ামী লীগের সমর্থকেরা। বুধবার এমনই জানান শেখ হাসিনা। অর্থাৎ নির্বাচন কমিশন তাঁদের কী বয়কট করবে,তারাই নির্বাচন কমিশনকে বয়কট করছে। বলেছিলাম না হাসিনা পোড় খাওয়া রাজনীতিবিদ। ছাইচাপা আগুনকে তিনি দাবানলে রূপ দিতে পারেন। তাঁর বক্তব্য, আওয়ামী লীগ বাংলাদেশে নির্বাচনে ভোটদানে বিরত থাকলে লক্ষ লক্ষ মানুষ বাংলাদেশের নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় শামিল হবেন না। ফলে নির্বাচনের ফল কী হবে সেটা আশা করি আপনি অনুমান করতে পারছেন।
ইউনুসের আমলে বাংলাদেশে এগোচ্ছে না পিছোচ্ছে ?
১। বেশকিছু উদাহরন আমি আপনাদের সামনে তুলে ধরছি। প্রথমেই একটা ইন্টারেস্টিং কথা দিয়ে শুরু করি। বলছি, দুবাই তো মরুভূমির দেশ। আমি অন্তত যতদূর জানি। আর মরুদেশ হওয়া মানে সেখানে চাল উৎপন্ন হওয়াও সম্ভব নয়। ফলে চালের জন্য দুবাইকে অন্যদেশের উপর নির্ভর করতে হবে। এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু মজার বিষয় কি জানেন, বাংলাদেশ দুবাই থেকে চাল আমদানি করছে। অর্থাৎ বাংলাদেশ এখন সরাসরি চাল নিচ্ছে না ভারত থেকে। তারা চাল কিনছে দুবাই থেকে। আবার দুবাইও ভারত থেকে চাল কেনে। এই দ্বিচারিতা করে ইউনুস কি বোঝাতে চাইছেন,ভারতীয় চাল হারাম। আর সেই চাল দুবাই গিয়ে হালাল হয়ে বাংলাদেশে ফিরছে।
২। আবার ট্রাম্পও চাপ দিচ্ছে বাংলাদেশকে। ফলে সস্তায় রাশিয়া থেকে গম কেনা ছেড়ে এখন দামি আমেরিকান গম কিনছে ইউনুসের দেশ। বিনিময়ে বাংলাদেশের পোষাক রপ্তানি শুল্ক ৩৭ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২০ শতাংশ করছে আমেরিকা। সেটা একটা বিষয়। আগে বাংলাদেশ রাশিয়ার থেকে গম কিনতো প্রতি টন ২২৬ ডলারে। আর এখন সেই গম আমেরিকা থেকে কিনছে প্রতি টন ৩০৮ ডলারে । ট্রাম্প প্রশাসনের বাণিজ্যনীতি, বাংলাদেশের উপর নতুন অর্থনৈতিক বোঝা। যার ফল ভোগ করবে বাংলাদেশের খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ।
৩। পর্তুগালও এবার বাংলাদেশী বিতাড়ন শুরু করেছে। পর্তুগালের ডানপন্থী রাজনীতিবিদ আন্দ্রে ভেনচুরা, তার নির্বাচনী প্রচারে বলেছেন – ইটস নট এ বাংলাদেশ অর্থাৎ এটা বাংলাদেশ নয়। তার মূল ইস্যু হল অবৈধ বাংলাদেশী অভিবাসন, যা ইউরোপ জুড়ে রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয়। ভেনচুরা স্পষ্ট করেছেন, অবৈধ বাংলাদেশী অভিবাসীদের জন্য পর্তুগালে কোনও জায়গা নেই। ভারতেরও এখন সময় এসেছে অবৈধ বাংলাদেশী অভিবাসীদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়ার। সীমান্ত নিরাপত্তা শুধু প্রতিরক্ষা নয়, এটা একটা জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নও।
৪। পর্তুগালের আগে সৌদি আরবও কিন্তু বাংলাদেশী ইস্যুতে বেশ কড়াকড়ি পদক্ষেপ করেছে আগেই। বাংলাদেশীদের ভিসা আটকে দেওয়ার কথাও শোনা গিয়েছে। এমনকি সৌদিতে যে সমস্ত বাংলাদেশী শ্রমিক রয়েছেন তাদের ক্ষেত্রেও কড়াকড়ি করছে সৌদি সরকার। জানিয়ে রাখি সৌদি আরবে প্রায় এক লক্ষ বাংলাদেশী রয়েছেন। অন্যদিকে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ের স্টার্মারও দেখা করতে অস্বীকার করেছেন ইউনুসের সঙ্গে ।
সবমিলিয়ে ইউনুসের মিলিঝুলি সরকার একেবারে ঘেঁটে ঘ। কারণ ইউনুসকে সামনে রেখে তো পিছন থেকে খেলা খেলছেন অন্য কেউ। সেটা কখনও জামাত আবার কখনও বিএনপি আর ইউনুসের স্নেহধন্য নাহিদদের দল এনসিপির কথা ছেড়ে দিলাম। তাদের খুব একটা পাত্তা দেয়না বাংলাদেশের আমজনতা।
এদিকে ইউনুসের আবার খুব ক্ষমতার লোভ। কোনও ভাবেই তিনি চান না তার গদি হাতছাড়া হোক। বিএনপি আবার ক্ষমতায় ফেরার স্বপ্ন দেকছে। তারেক রহমান দীর্ষদিন প্রবাস বাস কাটিয়ে ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের আগে দেশে ফিরবেন। তিনি আবার বিএনপি-র প্রধানমন্ত্রীর মুখ। জামাত চাইছে ধমকে-চমকে মানুষকে ভয় দেখিয়ে বাংলাদেশে একটা ভয়ের পরিবেশ তৈরি করতে। মহিলাদের অধিকার খর্ব করে গৃহবন্দী করে রাখাই জামাতের প্রধান উদ্দেশ্য। নাহিদ ইসলামের দল এনসিপি এখানে ছাগলের তৃতীয় সন্তান। ম্যায় ম্যায় তু তু করাই এখন তাদের কাজ বলা যেতে পারে।
আর একটা কথা বলছি। ইউনুস সাহেব ভয় পাচ্ছেন। আতঙ্কে থাকছেন। আসলে তার আসে পাশে যা ঘটনা ঘটছে সব তাতে আতঙ্কে থাকারই কথা। কারণ ইউনুস ইতিমধ্যে জেনে গিয়েছেন তার ও তার দলের বিরুদ্ধে আদালতে গিয়েছে আওয়ামী লীগ। বেশ কয়েক দিনের মধ্যে বাংলাদেশে একেবারে উল্কাগতিতে বৃদ্ধি পেয়েছে আওয়ামী লীগের কার্যকলাপ। তাদের ঝটিকা মিছিল দেখা যাচ্ছে। কিন্তু ইউনুস সরকারের স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বাংলাদেশ পুলিশকে সতর্ক থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। নির্দেশ দিয়ে কি বলা হয়েছে,বলা হয়েছে,আওয়ামী লীগের কোনও কার্যক্রম বাংলাদেশে দেখা গেলে সেটা অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। আওয়ামী লীগের মিটিং-মিছিলে অংশ নেওয়া প্রত্যেককে গ্রেফতারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তাহলে বিষয়টা কি দাঁড়াল.. ইউনুস ভয় পাচ্ছে তো। নাকি হাসিনার স্বপ্ন দেখেছেন তিনি। হতেও পারে শেখ মুজিবও স্বপ্নে দেখা দিতে পারেন ইউনুসকে। ওই ইউনুসের কথায়, রিসেট বাটন প্রেসের মাধ্যমে। ইতিমধ্যে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টে বাংলাদেশের বর্তমান ঘটমান পরিস্থিতি নিয়ে একটি মামলা হয়েছে ২৭ অগাস্ট। শুনানিও রয়েছে দ্রুত।
একটা বিখ্যাত উক্তি আছে জানেন তো, দশকের পর দশক ধরে কিছুই ঘটে না। আবার কয়েক সপ্তাহের মধ্যে দশকের ঘটনা ঘটে যায়। হ্যাঁ সত্যি তাই, ২০২৪ সালে জুলাই-অগাস্টে যে ঘটনা ঘটেছিল তা দশকের ঘটনাকেও হার মানাবে। এক ঝটকায় বদলে যায় বাংলাদেশের রাজনীতি-অর্থনীতি-সমাজনীতি। দেখুন,পরাধীন বাংলাদেশ আর বর্তমান বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। প্রাক-বাংলাদেশে স্বাধীনতা অর্জনই ছিল মূল মূখ্য। কিন্তু হাসিনাহীন বাংলাদেশে নতুন করে স্বাধীনতার জন্য লড়াই করতে হচ্ছে বাংলাদেশবাসীকে। ইউনুসের শাসন যদি আরও বেশিদিন বাংলাদেশে দীর্ঘায়িত হয় তাহলে, উপহার হিসেবে বাংলাদেশের মানুষ পাবে মেধাশূন্য, মেরুদণ্ডহীন একদল পাতি নেতা। আর সেই সুযোগ কাজে লাগাবে কিছু সুযোগ সন্ধানী মানুষ। ফলে জাতীয় রাজনীতির কলকাঠি চলে যাবে সুযোগ সন্ধানী কালো টাকার মালিকদের হাতে। আর যেটার আভাস এখন কিছুটা হলেও দেখা যাচ্ছে হাসীনাহীন বাংলাদেশে। ফলে সোনার বাংলা গঠনে নির্বাচনই নিউক্লিয়াস।