রণজিৎ রায়, নিজস্ব সংবাদদাতা : তৃণমূল ঘনিষ্ঠ ব্যক্তির ওটা বাড়ি না রাজপ্রাসাদ? মধ্য হাওড়ার বকলমে তৃণমূল নেতার বাড়ির বেসমেন্টে রাজপ্রাসাদের হদিশ। এই ভিডিও ইতিমধ্যেই ভাইরাল হয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ায়। যা নিয়ে তীব্র হইচই পড়ে গিয়েছে চারিদিকে।

বাড়ির তলায় গোপন সুড়ঙ্গ। সুড়ঙ্গ পেরলেই সিংহদুয়ার। নেমপ্লেটে লেখা শামিম আহমেদের নাম। দরজা খুললেই ভিতরে এলাহি ব্যবস্থা। গোটা বাড়ির সিসিটিভি মনিটরিং চলছে ওই ঘর থেকে। হাওড়ার শিবপুরের তৃণমূল ঘনিষ্ঠ ওই শামিম আহমেদের বাড়ির এই ভিডিও ইতিমধ্যেই ভাইরাল হয়েছে।
রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী অরূপ রায় ঘনিষ্ঠ শামিম আহমেদ ওরফে বড়ে-র বাড়িতে তল্লাশি চালাতে গিয়ে পুলিশের চোখ কপালে। বাড়ি না রাজপ্রাসাদ বোঝা মুস্কিল। বাড়ির ভিতর দিয়ে নেমেছে গোপন সুড়ঙ্গ। ভোট পরবর্তী পরিস্থিতিতে বিজেপির এক সংখ্যালঘু নেতার ওপর হামলার অভিযোগ ওঠে শামিম আহমেদের বিরুদ্ধে। সেই ঘটনার পর থেকেই শামিমের কোনও খোঁজ নেই। তার খোঁজ করতে গিয়েই বেরিয়ে এল বাড়ির ভিতরের সেই বিলাশবহুল ছবি।
পুলিশ জানিয়েছে, শামিমের বাড়ির গ্রাউন্ড ফ্লোরের মেঝে কাঠ দিয়ে তৈরি। তাতেই সন্দেহ হয় পুলিশের। ফ্লোরের পাটাতন সরাতেই চক্ষু চড়কগাছ পুলিশের। দেখা যায়, নীচে নামার একটা সিঁড়ি। সেই সিঁড়ি বেয়ে নীচে নামতেই দেখা যায় এক বিশাল বেসমেন্ট। সেখানে ঠাসা দামি আসবাবপত্র, দামি ফ্রিজ, এসি, সোফা সহ আরও অনেক কিছু। সেখান থেকে নিয়ন্ত্রিত হত পুরো বাড়ির সিসিটিভি ক্যামেরা। এমনকী সেখানে একটি গোপন সুড়ঙ্গও ছিল বলে সূত্রের খবর। তল্লাশির সময়ে পুলিশ একটি মোবাইল ফোন বাজেয়াপ্ত করেছে। আপাতত বাড়িটি সিল করে দেওয়া হয়েছে। তবে সেখান থেকে কোনও বিস্ফোরক বা অস্ত্র উদ্ধার হয়নি।

কে এই শামিম আহমেদ? মধ্য হাওড়ায় কান পাতলে শোনা যায়, শামিম আহমেদ প্রাক্তন মন্ত্রী অরূপ রায়ের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ছিলেন। একসময় শপিংমলে সামান্য কর্মচারীর চাকরি করা শামিম পরবর্তীতে বকলমে হয়ে যান দাপুটে তৃণমূল নেতা। মধ্য হাওড়ার ৩৬ নম্বর ওয়ার্ডের প্রাক্তন কাউন্সিলর শামীমা বানু-র স্বামী তিনি। বড়ে-র স্ত্রী শামীমা বানু ২০১৩ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত হাওড়া পুরসভার ৩৬ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ছিলেন। মধ্য হাওড়া বিধানসভার সংখ্যালঘু এলাকায় কেউ কেউ তাকে বলেন ডন। মধ্য হাওড়ার শিবপুর থানার অন্তর্গত ৩৬ নম্বর ওয়ার্ডের বেতাজ বাদশা শামিম আহমেদ ওরফে বড়ে। তৃণমূলের ছত্রছায়ায় দীর্ঘদিন থেকে ওই এলাকায় দাপট চালিয়ে এসেছেন মধ্য হাওড়ার প্রাক্তন মন্ত্রী অরূপ রায় ঘনিষ্ঠ বড়ে। ভোটের ফল ঘোষণার পর চওড়াবস্তি এলাকা অশান্ত হয়। গত ৮ মে চওড়াবস্তি এলাকায় বোমাবাজি ও গুলি চালানোর ঘটনার অভিযোগ ওঠে এই বড়ে ও তার দলবলের বিরুদ্ধে। আর সেই ঘটনাতেই ফেরার প্রাক্তন মন্ত্রী অরূপ রায় ঘনিষ্ঠ এই শামিম আহমেদ ওরফে বড়ে।
এই প্রথমবার শামিমের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠল তা নয়। আগেও তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে। রামনবমীর শোভাযাত্রায় হামলা চালানোর অভিযোগে এনআইএ তদন্তভার নিয়ে গ্রেফতার করেছিল এই বড়েকে।
এদিকে এই ঘটনা সামনে আসতেই শামীম আহমেদের সঙ্গে দূরত্ব তৈরির চেষ্টা রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী অরূপ রায়ের। তিনি বলেন, মধ্য হাওড়ার প্রত্যেক ব্যক্তি তাঁর ঘনিষ্ঠ। তবে কেউ যদি অন্যায় করে থাকে তাহলে পুলিশ অভিযুক্তের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নিক। আইন আইনের পথে চলবে, তৃণমূল কংগ্রেসের কেউ এই বিষয়ে নাক গলাবে না বলেও বড় দাবি করেছেন রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী অরূপ রায়।
তবে অরূপ রায় যতই দূরত্ব তৈরির চেষ্টা করুন, পুরনো ছবি দেখিয়ে বড়ে যে তাঁর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সেই দাবি করছেন স্থানীয় বিজেপি নেতৃত্বরা।
এদিকে রাজ্যের মন্ত্রী দিলীপ ঘোষ বলেন, গুহা-সুড়ঙ্গ আরও অনেক কিছুই বেরবে। টাকার পাহাড়ও বেরবে। শিবপুরের বিধায়ক রুদ্রনীল ঘোষ বলেন, ৫০০ বছরের পুরনো শহরের এই অরূপ রায়রাই নষ্ট করে দিয়েছে। জমি প্রোমোটিং, লুঠ, মাদক ব্যবসার মতো অভিযোগ উঠেছে এই শহরে। সবটাই অপারেট করার মাস্টারমাইন্ড অরূপ রায়। পুলিশের ওপর চাপ তৈরি করে রেখেছিলেন। শামিমের মতো হাজার হাজার অপরাধী তৈরি করেছেন তিনি।

ক্ষমতা বদলের পর এলাকার বাদশা’দের রাজপাট ভাঙছে। তবু প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে, রাজনৈতিক ছাতার তলায় এতদিন কীভাবে গজিয়ে উঠল মাটির নীচের এই সাম্রাজ্য? এখন প্রশ্নটা হচ্ছে রাজ্যে তো পালাবদল হয়েছে। আর পালাবদলের পরপরই সমাজবিরোধীরাও নিজেদের জার্সি পাল্টে ফেলার ভুড়ি ভুড়ি অভিযোগও রয়েছে। সেখানে মধ্য হাওড়া-তেও এই ঘটনা ঘটবে না তো, এই প্রশ্নই এখন ঘোরাফেরা করছে।