বাড়ি কেনার স্বপ্ন পূরণ করতে বহু মানুষ বছরের পর বছর ধরে হোম লোনের EMI দেন। কেউ ১৫ বছর, কেউ আবার ২০ বা ২৫ বছর ধরে কিস্তি মিটিয়ে শেষ পর্যন্ত ঋণমুক্ত হন। কিন্তু ঋণ শোধ হয়ে গেলেও যদি ব্যাঙ্ক আপনার বাড়ির আসল দলিল ফেরত দিতে দেরি করে, তখন কী করবেন? বারবার ব্যাঙ্কে ঘুরেও যদি সম্পত্তির কাগজ হাতে না পান, তাহলে আপনার জন্য রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ একটি নিয়ম। শুধু দলিল ফেরত দেওয়াই নয়, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ঋণদাতাকে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ করতে হয়। আর সেই নিয়ম না মানলে ঋণগ্রহীতা পেতে পারেন মোটা অঙ্কের ক্ষতিপূরণ! কী বলছে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া বা RBI-র নির্দেশিকা? কত দিনের মধ্যে ফেরত দিতে হবে সম্পত্তির কাগজ? আর কোন পরিস্থিতিতে প্রতিদিন ৫ হাজার টাকা করে ক্ষতিপূরণ পাওয়া যেতে পারে?

ঋণ শোধের পর কী করতে হবে ব্যাঙ্ককে?
RBI-র ২০২৩ সালের ১৩ সেপ্টেম্বরের নির্দেশিকা অনুযায়ী, প্রযোজ্য ব্যক্তিগত ঋণ সম্পূর্ণ শোধ বা নিষ্পত্তি হয়ে গেলে ঋণদাতাকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে গ্রাহকের আসল সম্পত্তির কাগজপত্র ফেরত দিতে হবে। শুধু তাই নয়, সম্পত্তির উপর ঋণের কারণে কোনও রেজিস্ট্রিতে যে চার্জ বা বন্ধক সংক্রান্ত নথিভুক্তি রয়েছে, সেটিও সরানোর ব্যবস্থা করতে হবে। এই কাজের জন্য সময়সীমা- ঋণ সম্পূর্ণ শোধ বা নিষ্পত্তির পর ৩০ দিন। অর্থাৎ, ঋণ মিটিয়ে দেওয়ার পরও সম্পত্তির আসল দলিল ফেরত পাওয়ার জন্য অনির্দিষ্টকাল অপেক্ষা করতে হবে না। RBI-র নির্দেশিকায় এ বিষয়ে স্পষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে।
৩০ দিন পেরিয়ে গেলেই কী ক্ষতিপূরণ মিলবে?
এবার আসল বিষয়টি। যদি ঋণদাতার কারণে ৩০ দিনের মধ্যে সম্পত্তির আসল কাগজপত্র ফেরত দেওয়া না হয়, অথবা প্রয়োজনীয় রেজিস্ট্রি থেকে ঋণের চার্জ সরানোর কাজ সম্পন্ন না হয়, তাহলে সংশ্লিষ্ট ঋণদাতাকে বিলম্বের কারণ গ্রাহককে জানাতে হবে। আর দেরির জন্য ঋণদাতা দায়ী হলে, RBI-র নির্দেশিকা অনুযায়ী গ্রাহককে প্রতি দিনের জন্য ৫,০০০ টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। ধরা যাক, নির্ধারিত ৩০ দিনের সময়সীমা পেরিয়ে যাওয়ার পর ঋণদাতার দায়ে আরও ১০ দিন দেরি হল। সে ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নিয়ম অনুযায়ী ক্ষতিপূরণের অঙ্ক হতে পারে ৫০ হাজার টাকা। তবে মনে রাখতে হবে, এই ক্ষতিপূরণ স্বয়ংক্রিয়ভাবে সব ক্ষেত্রে পাওয়া যায় না। বিলম্বের জন্য ঋণদাতা দায়ী কি না, সেটি গুরুত্বপূর্ণ।
কোন কোন ঋণের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য এই নিয়ম?
এই নিয়ম শুধু বাড়ির ঋণের ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়। RBI-র নির্দেশিকার আওতায় থাকা ব্যক্তিগত ঋণের মধ্যে বাড়ি বা গাড়ির মতো সম্পত্তি-সুরক্ষিত ঋণও পড়তে পারে। বাণিজ্যিক ব্যাঙ্ক, স্মল ফিনান্স ব্যাঙ্ক, রিজিওনাল রুরাল ব্যাঙ্ক, নির্দিষ্ট কো-অপারেটিভ ব্যাঙ্ক, NBFC এবং হাউজিং ফিনান্স সংস্থার মতো বিভিন্ন নিয়ন্ত্রিত ঋণদাতার ক্ষেত্রে এই নির্দেশিকা প্রযোজ্য। তবে সংশ্লিষ্ট ঋণ ও ঋণদাতা নির্দেশিকার আওতায় পড়ছেন কি না, তা যাচাই করা জরুরি। আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়- গ্রাহক কোথা থেকে আসল নথি সংগ্রহ করবেন, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ারও সুযোগ রয়েছে। ঋণের কাজ যে শাখায় হয়েছে, সেখান থেকে অথবা ঋণদাতার অন্য যে অফিসে নথি রাখা রয়েছে, সেখান থেকেও কাগজ সংগ্রহের বিকল্প দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
দলিল হারিয়ে গেলে কী হবে?
ধরুন, ঋণ শোধ হয়ে গিয়েছে, কিন্তু ব্যাঙ্ক জানাল যে আসল দলিল হারিয়ে গিয়েছে বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সে ক্ষেত্রে কী করবেন? RBI-র নির্দেশিকা অনুযায়ী, ঋণদাতাকে ডুপ্লিকেট বা প্রত্যয়িত কপি সংগ্রহে সাহায্য করতে হবে এবং সংশ্লিষ্ট খরচ বহন করতে হবে। এ ধরনের ক্ষেত্রে নথি পুনরুদ্ধার বা বিকল্প নথি সংগ্রহের জন্য অতিরিক্ত ৩০ দিন সময় দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, এই পরিস্থিতিতে ক্ষতিপূরণ গণনার সময়সীমা সাধারণ ক্ষেত্রে ৩০ দিনের বদলে মোট ৬০ দিন পর্যন্ত হতে পারে।
সব মিলিয়ে, ঋণ শোধ করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না ঋণদাতারও। প্রযোজ্য ক্ষেত্রে ৩০ দিনের মধ্যে আসল সম্পত্তির কাগজ ফেরত দেওয়া এবং রেজিস্ট্রি থেকে ঋণের চার্জ সরানোর ব্যবস্থা করা বাধ্যতামূলক। তাই আপনার ঋণ সম্পূর্ণ শোধ হয়ে যাওয়ার পরও যদি সম্পত্তির দলিল না ফেরত পান, তাহলে ঋণ বন্ধের প্রমাণ, পেমেন্টের রসিদ এবং ব্যাঙ্কের সঙ্গে যোগাযোগের নথি সংরক্ষণ করুন। প্রয়োজনে লিখিতভাবে অভিযোগ জানান এবং RBI-র নির্দেশিকার ভিত্তিতে ক্ষতিপূরণ দাবি করার বিষয়টি বিবেচনা করুন।