প্রতিবাদের মঞ্চ কি এবার বদলাতে চলেছে? দিল্লির রাজপথে গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে এতদিন বারবার উঠে এসেছে যন্তর মন্তরের নাম। কিন্তু সেই যন্তর মন্তরেই যদি প্রতিবাদ করতে গিয়ে আটক হতে হত আন্দোলনকারীদের, তাহলে বিকল্প জায়গা কোথায়?

একদিকে যন্তর মন্তরে বিক্ষোভ, অন্যদিকে ধরপাকড়ের অভিযোগ। এই আবহেই আলোচনায় উঠে আসছে রামলীলা ময়দান। কিন্তু এই বিশাল ময়দান কতদিন ফাঁকা পড়ে থাকে? এখানে সভা বা প্রতিবাদ কর্মসূচি করতে গেলে অনুমতি পাওয়ার প্রক্রিয়া কী? আর প্রতিদিন ময়দান ব্যবহারের খরচই বা কত?এরই মধ্যে যন্তর মন্তরে গিয়ে আটক হওয়ার খবর সৌরভ দাস এবং আশুতোষ রাঙ্কার। কেন সেখানে পৌঁছেছিলেন তাঁরা? কী পরিস্থিতিতে তাঁদের আটক করা হল? আর এই ঘটনা কি আন্দোলনের কৌশল বদলের ইঙ্গিত দিচ্ছে?

দিল্লির যন্তর মন্তর। বছরের পর বছর ধরে এই জায়গা শুধু একটি রাস্তার নাম নয়, বরং দেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের পরিচিত ঠিকানা। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, ছাত্র সংগঠন, নাগরিক সমাজ এবং সামাজিক আন্দোলনের কর্মীরা নিজেদের দাবি নিয়ে এখানে হাজির হয়েছেন। সংসদ ভবনের কাছাকাছি অবস্থানের কারণে এই জায়গার রাজনৈতিক গুরুত্বও বরাবরই বেশি।কিন্তু এবার সেই পরিচিত ছবিতেই বদল। সাম্প্রতিক নির্দেশে যন্তর মন্তরকে সরকারি ভাবে নির্ধারিত প্রতিবাদস্থলের তালিকা থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। তার পরিবর্তে দিল্লি পুলিশ তিনটি জায়গাকে বিক্ষোভের জন্য নির্দিষ্ট করেছে-রামলীলা ময়দান, উত্তর দিল্লির বুরারি ময়দান এবং পূর্ব দিল্লির CBD গ্রাউন্ড। অর্থাৎ, প্রতিবাদ বন্ধ নয়, কিন্তু প্রতিবাদের জায়গা বদল। আর ঠিক এই সিদ্ধান্ত ঘিরেই উঠছে একাধিক প্রশ্ন। প্রতিবাদ করার অধিকার যদি থাকে, তাহলে সেই প্রতিবাদের জায়গা নির্ধারণের ক্ষেত্রে কী কী শর্ত থাকবে? নতুন জায়গাগুলিতে পৌঁছনো, অনুমতি পাওয়া এবং বিপুল খরচ বহন করা-সব আন্দোলনকারীর পক্ষে কি সমান সহজ? এই প্রশ্নের মধ্যেই সামনে এসেছে রামলীলা ময়দানের নাম। যে ময়দান একসময় বড় বড় রাজনৈতিক সমাবেশের সাক্ষী থেকেছে, এবার সেখানেই কি জমবে প্রতিবাদের লড়াই?
দিল্লির রামলীলা ময়দান আয়তনে প্রায় ১২ একর। এখানে একসঙ্গে প্রায় ৫০ হাজার মানুষের জমায়েত হতে পারে। শুনতে মনে হতে পারে, এত বড় ময়দানে প্রতিবাদের জন্য জায়গার অভাব হওয়ার কথা নয়। কিন্তু বাস্তবের হিসাব বলছে অন্য কথা। একাধিক সংবাদমাধ্যমের রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২৬ সালের বাকি সময়ে রামলীলা ময়দানে বুকিংয়ের জন্য মাত্র তিনটি দিন খালি-২৯, ৩০ এবং ৩১ ডিসেম্বর। অর্থাৎ, অক্টোবরের মাঝামাঝি থেকে ডিসেম্বরের শেষ পর্যন্ত প্রায় আড়াই মাসের মধ্যে অন্য দিনগুলিতে নতুন বুকিংয়ের সুযোগ ছিল না। তাহলে প্রশ্ন উঠছে, যন্তর মন্তরের বিকল্প হিসেবে যে জায়গাকে সামনে আনা হচ্ছে, সেখানে যদি আগাম বুকিং না পাওয়া যায়, তাহলে জরুরি কোনও প্রতিবাদ কর্মসূচি কীভাবে আয়োজন করা হবে? আন্দোলনের ক্ষেত্রে সময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, প্রশাসনিক নির্দেশ কিংবা জনস্বার্থের কোনও ইস্যুতে দ্রুত প্রতিবাদ জানাতে চাইলে নির্দিষ্ট জায়গা ও অনুমতির ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। সেই জায়গাতেই যদি দীর্ঘ অপেক্ষা করতে হয়, তাহলে আন্দোলনের গতি কি বাধা পাবে?
আরও একটি বিষয় মাথায় রাখতে হবে। রামলীলা ময়দান শুধু প্রতিবাদের জায়গা নয়, বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও সমাবেশের জন্যও ব্যবহৃত হয়। ফলে এর বুকিং, অনুমতি এবং ব্যবহারের নিয়মের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার প্রশ্নও। অতএব, ময়দান কতদিন খালি থাকে, তার উত্তর শুধু চোখে দেখে দেওয়া সম্ভব নয়। দেখতে হবে বুকিংয়ের ক্যালেন্ডার, অনুমোদিত অনুষ্ঠান এবং প্রতিবাদের জন্য নির্দিষ্ট সময়ের প্রকৃত প্রাপ্যতা।
একদিনের প্রতিবাদে খরচ কত? এক লক্ষ টাকারও বেশি। এবার আসা যাক সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নে। প্রতিবাদ করতে গেলে কত টাকা খরচ করতে হবে? রামলীলা ময়দান বুকিংয়ের খরচ,একদিনের বুকিং ফি ৫০,০০০ টাকা।ফেরতযোগ্য নিরাপত্তা জামানত ৫৫,০০০ টাকা কর-সহ প্রাথমিক মোট খরচ ১,২১,০৮০ টাকা, অর্থাৎ, একদিনের জন্য রামলীলা ময়দান বুক করতে প্রাথমিকভাবে খরচ হতে পারে ১ লক্ষ ২১ হাজার টাকারও বেশি। এর মধ্যে ৫০ হাজার টাকা বুকিং ফি, ৫৫ হাজার টাকা নিরাপত্তা জামানত এবং বাকি অংশে কর-সহ অন্যান্য হিসাব রয়েছে। নিরাপত্তা জামানত ফেরতযোগ্য হলেও প্রথমেই এই টাকা জোগাড় করতে হবে আয়োজকদের।এবার ভাবুন, কোনও ছোট নাগরিক সংগঠন কিংবা ছাত্র সংগঠন যদি নিজেদের দাবি নিয়ে একদিনের বিক্ষোভ করতে চায়, তাহলে এই টাকা কোথা থেকে আসবে? আর আন্দোলন যদি একদিনে শেষ না হয়? যদি টানা তিন দিন কর্মসূচি চালাতে হয়? সেক্ষেত্রে বুকিংয়ের খরচের পাশাপাশি পরিবহণ, পানীয় জল, মাইক, মঞ্চ, স্বেচ্ছাসেবক এবং অন্যান্য ব্যবস্থাপনার খরচও বিবেচনায় আসবে।
আর রামলীলা ময়দান নিয়েএই বিতর্কের মধ্যেই যন্তর মন্তরে গিয়ে আটক সৌরভ দাস এবং আশুতোষ রাঙ্কা। কেন তাঁরা সেখানে গেলেন? কী ছিল তাঁদের দাবি? নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে ভোটার তালিকা সংশোধন ও ভোট চুরির অভিযোগ তুলে প্রতিবাদ জানাতে চেয়েছিল ককরোচ জনতা পার্টি বা CJP। সেই কর্মসূচিকে কেন্দ্র করেই নতুন করে উত্তেজনা ছড়ায় দিল্লিতে। মঙ্গলবার সৌরভ দাস, আশুতোষ রাঙ্কা এবং দলের অন্য সদস্যরা জাতীয় পতাকা হাতে যন্তর মন্তরে ঢোকার চেষ্টা করেন। তাঁরা ভারত মাতা কি জয় এবং ইনকিলাব জিন্দাবাদ স্লোগান দেন। এরপর তাঁদের আটক করে দিল্লি পুলিশ।
যন্তর মন্তর বহুদিন ধরে প্রতিবাদের পরিচিত কেন্দ্র। রামলীলা ময়দানও অতীতে বড় বড় প্রতিবাদ, বিক্ষোভের সাক্ষ্মী থেকেছে। সেই জায়গা থেকে অন্যত্র সরতে হলে বিকল্প স্থানগুলিতে পর্যাপ্ত সুযোগ, স্পষ্ট অনুমতির নিয়ম এবং আর্থিকভাবে বাস্তবসম্মত ব্যবস্থা থাকা জরুরি। নাহলে কাগজে-কলমে প্রতিবাদের জায়গা থাকলেও, বাস্তবে সেখানে পৌঁছনোর পথ কঠিন হয়ে উঠতে পারে। সৌরভ দাস এবং আশুতোষ রাঙ্কাদের আটক হওয়ার ঘটনা তাই শুধু একটি বিক্ষোভের খবর নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে রাজধানীতে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের সুযোগ, প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ এবং গণতান্ত্রিক অধিকার নিয়ে বৃহত্তর বিতর্ক।