অনুসূয়া দাস, সাংবাদিক : কে কতটা সংগঠন গড়ে তুলতে পেরেছেন, কার পোলিং এজেন্ট কতটা সক্রিয়, আর ভোটারদের সঙ্গে কার সংযোগ কতটা গভীর, সবকিছুর ফলাফল মাপা হবে এই পরীক্ষায়। এ হল ভোটের প্রথম দিনের পরীক্ষা। বাংলার নির্বাচনী ময়দানে প্রথম দফার ভোটগ্রহণ মানেই শুধু প্রক্রিয়া নয়, বরং রাজনৈতিক শক্তির প্রথম বাস্তব যাচাই। এতদিনের সভা, মিছিল, প্রতিশ্রুতির কতটা কাজে এল। তারই অগ্নিপরীক্ষা। ২৩ এপ্রিল প্রথম দফায় ভোট ১৬ জেলায়।

১৬টি জেলার দিকে নজর দেওয়া যাক। প্রথম দফায় ভোট হবে উত্তরবঙ্গের কোচবিহারে।
কোচবিহার (৯)
২০২১ সালের ফল
তৃণমূল ২
বিজেপি ৭
গতবারে উত্তরবঙ্গে বাকি জেলাগুলির মধ্যে কোচবিহারে সবথেকে বেশি আসন পেয়েছিল বিজেপি। পদ্মশিবির যেখানে ৭টি আসন পেয়েছিল, তৃণমূল ২টি। এবারেও কোচবিহারের দুটি বিধানসভা কেন্দ্রে হতে চলেছে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই। বিশেষভাবে নজর কেড়েছে যে দুটি আসন। তা হল দিনহাটা ও তুফানগঞ্জ। দিনহাটা কোচবিহারের রাজনৈতিক মানচিত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক কেন্দ্র। জমে উঠেছে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই। উদয়ন গুহ বনাম অজয় রায়। উদয়ন গুহ তৃণমূলের অভিজ্ঞ এবং প্রতিষ্ঠিত মুখ। অন্যদিকে অজয় রায় বিজেপির তরুণ ও আক্রমণাত্মক মুখ। তিনি পরিবর্তনের বার্তা, কেন্দ্রীয় প্রকল্পের প্রসার এবং স্থানীয় অসন্তোষকে হাতিয়ার করে লড়াইকে জমিয়ে তুলেছেন। তুফানগঞ্জের তৃণমূল প্রার্থী শিবশঙ্কর পাল ও বিজেপির মালতী রাভা রায়। অন্যান্য কেন্দ্রগুলির পাশাপাশি বিশেষ নজর কেড়েছে এই দুটি আসন। কোচবিহারের পাশাপাশি প্রথম দফাতেই ভোট রয়েছে আলিপুরদুয়ারে।
আলিপুরদুয়ার (৫)
২০২১ সালের ফল
তৃণমূল ০
বিজেপি ৫
আগের বারে যেখানে ঘাসফুল ফুটতেই দেয়নি পদ্মফুল। সেই আলিপুরদুয়ারে এবারে অন্যান্য কেন্দ্রের পাশাপাশি বিশেষভাবে নজর কেড়েছে আলিপুরদুয়ার বিধানসভা কেন্দ্র। তৃণমূলের সুমন কাঞ্জিলালের সঙ্গে লড়াই হতে চলেছে বিজেপির পরিতোষ দাসের।
জলপাইগুড়ি (৭)
২০২১ সালের ফল
তৃণমূল ৩
বিজেপি ৪
২০২১-র এই ফলাফল দেখেই বোঝাই যাচ্ছে, আগের বারেই হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হয়েছিল এই জেলায়। এবারেও ৭টি আসনের মধ্যে বিশেষ ভাবে শিরোনামে উঠে এসেছে ধূপগুড়ি ও রাজগঞ্জ আসন। ধূপগুড়ি আসন নির্মল চন্দ্র রায়ের জন্য লাইমলাইটে উঠে এসেছে। এই আসনে অন্যতম আলোচনায় নির্মল চন্দ্র রায়।তাঁর প্রার্থিতা ঘিরে ইতিমধ্যেই এলাকায় রাজনৈতিক উত্তাপ বাড়তে শুরু করেছে। স্থানীয় রাজনীতিতে পরিচিত মুখ তিনি। স্বপ্না বর্মনের জন্য বিশেষভাবে নজর কেড়েছে রাজগঞ্জ বিধানসভা কেন্দ্রটিও। কোচবিহার, আলিপুরদুয়ার, জলপাইগুড়ির পাশাপাশি কালিম্পংয়েও ভোট হতে চলেছে প্রথম দফাতেই। এক নজরে দেখে নেওয়া যাক, কালিম্পংয়ে একটি আসনে কে ছিনিয়ে নিয়েছিল জয়ের হাসি।
কালিম্পং (১)
২০২১ সালের ফল
নির্দল ও অন্যান্য ১ , বিজেপি ০
দার্জিলিং (৫)
২০২১ সালের ফল
তৃণমূল ০, বিজেপি ৫
দার্জিলিংয়ের পাঁচটির মধ্যে পাঁচটিতেই জয় ছিনিয়ে নিয়েছিল বিজেপি। দাঁত ফোটাতেও পারেনি পদ্মশিবির। এবারে এই জেলা থেকে বিশেষভাবে নজর কেড়েছে যে আসন, তা হল শিলিগুড়ি। উত্তরবঙ্গের রাজনৈতিক হৃদস্পন্দন এই কেন্দ্র। আর সেই কেন্দ্রেই এবার হাইভোল্টেজ লড়াই। শঙ্কর ঘোষ বনাম গৌতম দেব। ২০২৬-এর নির্বাচনে এই আসন শুধু একটি কেন্দ্র নয়, বরং উত্তরবঙ্গের রাজনৈতিক বার্তা নির্ধারণের বড় মঞ্চ। শঙ্কর ঘোষ বিজেপির সংগঠনের ভরসার মুখ। শিলিগুড়ি সহ উত্তরবঙ্গে দলের বিস্তারে তাঁর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। মাঠের রাজনীতি, কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং ধারাবাহিক সংগঠন গড়ে তোলাই তাঁর বড় শক্তি। বিজেপির ভোটব্যাঙ্ককে একজোট রাখা এবং নতুন ভোটার টানাই তাঁর প্রধান লক্ষ্য। অন্যদিকে গৌতম দেব অভিজ্ঞ ও পরিচিত মুখ। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং স্থানীয় রাজনীতিতে গভীর প্রভাব তাঁকে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী করে তুলেছে। শিলিগুড়ি শহরের উন্নয়ন, পুরসভার অভিজ্ঞতা এবং সংগঠনের উপর তাঁর দখল তৃণমূলের বড় সম্পদ।
উত্তর দিনাজপুর (৯)
২০২১ সালের ফল
তৃণমূল ৭
বিজেপি ২
এবারের ভোটে এই জেলায় বিশেষ নজর কেড়েছে রায়গঞ্জ আসনটি। যেখানে প্রতি নির্বাচনে লড়াই থাকে হাড্ডাহাড্ডি। আর এবারের ভোটে এই কেন্দ্রের অন্যতম আলোচনার নাম তৃণমূল প্রার্থী কৃষ্ণ কল্যাণী। স্থানীয় রাজনীতিতে পরিচিত ও প্রভাবশালী মুখ। ব্যবসায়ী হিসেবেও তাঁর পরিচিতি রয়েছে, পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে এলাকার সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত। এই অভিজ্ঞতা তাঁকে রায়গঞ্জের ভোটযুদ্ধে এক শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে তুলেছে।
দক্ষিণ দিনাজপুর (৬)
২০২১ সালের ফল
তৃণমূল ৩
বিজেপি ৩
দক্ষিণ দিনাজপুরে ৬টি আসনের মধ্যে বিশেষ নজর কাড়ছে বালুরঘাট। এই কেন্দ্রেই তৈরি হয়েছে এক হাইভোল্টেজ লড়াইয়ের আবহ। তার কেন্দ্রে রয়েছেন অর্পিতা ঘোষ। এবারের তৃণমূল প্রার্থী অর্পিতা ঘোষ দলের অভিজ্ঞ ও পরিচিত মুখ। সাংসদ ও রাজনীতিক হিসেবে তাঁর দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা রয়েছে, পাশাপাশি সাংস্কৃতিক জগত থেকেও উঠে আসা তাঁর আলাদা পরিচিতি আছে। বালুরঘাটে তাঁর প্রার্থিতা তাই শুধু রাজনৈতিক নয়, বরং ব্যক্তিগত ইমেজের লড়াইও বটে। এই কেন্দ্রের রাজনীতিতে বরাবরই তৃণমূল বনাম বিজেপির সরাসরি টক্কর দেখা যায়। এবারেও তার অন্যথা হবে না বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল।
মালদহ (১২)
২০২১ সালের ফল
তৃণমূল ৮
বিজেপি ৪
এবারের ভোটে মালদহ জেলায় বিশেষ ভাবে নজর কেড়েছে দুটি আসন। সাবিনা ইয়াসমিনের জন্য সুজাপুর ও মৌসম নূরের জন্য মালতীপুরের দিকে বিশেষ নজর রয়েছে মালদাবাসীর।
মুর্শিদাবাদ (২২)
২০২১ সালের ফল
তৃণমূল ১৮
বিজেপি ২
মুর্শিদাবাদ। ভোটের সময় বরাবরই শিরোনামে থাকে এই জেলা। এবারে দুই হেভিওয়েটের জন্য নজর কেড়েছে তিন আসন। লাইমলাইটে রয়েছে রেজিনগর, বহরমপুর ও নওদা। রেজিনগর ও নওদায় এবারে প্রার্থী হয়েছেন হুমায়ুন কবীর নিজেই। প্রাক্তন প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি অধীর চৌধুরীর জন্য বিশেষ ভাবে নজর রয়েছে মুর্শিদাবাদের বহরমপুর কেন্দ্রের দিকে।
বীরভূম (১১)
২০২১ সালের ফল
তৃণমূল ১০
বিজেপি ১
বীরভূমের রাজনৈতিক লড়াইয়ে এবার আলাদা করে নজর কাড়ছে হাসন কেন্দ্র। জেলার বাকি আসনগুলোর ভিড়েও হাসন যেন বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। কারণ এখানে লড়াই শুধু দলীয় নয়, ব্যক্তিগত প্রভাব ও সংগঠনের শক্তিরও পরীক্ষা। কাজল শেখ এলাকার পরিচিত ও সক্রিয় রাজনৈতিক মুখ। দীর্ঘদিন ধরে মাটির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকার ফলে স্থানীয় স্তরে তাঁর একটা শক্ত সংগঠন তৈরি হয়েছে। সেই সংগঠনই এই নির্বাচনে তাঁর বড় ভরসা। অনুব্রতর সঙ্গে দ্বন্দ্বের পরেও কি হাসনে তৃণমূলের হাসি ফোটাতে পারবে কাজল শেখ। এছাড়াও আর কোন কোন জেলায় ভোট হতে চলেছে প্রথম দফায়। গতবারে কেমন ছিল ফলাফল। এক নজরে দেখে নেওয়া যাক।
পশ্চিম বর্ধমান (০৯)
২০২১ সালের ফল
তৃণমূল ৬, বিজেপি ৩
বাঁকুড়া (১২)
২০২১ সালের ফল
তৃণমূল ৪, বিজেপি ৮
পুরুলিয়া (০৯)
২০২১ সালের ফল
তৃণমূল ০৬, বিজেপি ০৯
পশ্চিম মেদিনীপুর (১৫)
২০২১ সালের ফল
তৃণমূল ১৩, বিজেপি ০২
পূর্ব মেদিনীপুর (১৬)
২০২১ সালের ফল
তৃণমূল ৯, বিজেপি ৭
ঝাড়গ্রাম (০৪)
২০২১ সালের ফল
তৃণমূল ০৪, বিজেপি ০০
কে কতটা সংগঠন গড়ে তুলতে পেরেছেন, কার পোলিং এজেন্ট কতটা সক্রিয়। ভোটারদের সঙ্গে কার সংযোগ কতটা গভীর। সবই ধরা পড়ে প্রথম দফার ভোটে। অনেক সময় এই পর্বই ঠিক করে দেয় পরের দফাগুলোর রণকৌশল। গ্রামাঞ্চল থেকে শহরতলি। সব জায়গাতেই এবার কড়া লড়াইয়ের আভাস। ভোটারদের অংশগ্রহণ, লাইনের দৈর্ঘ্য, বুথের পরিবেশ। সবকিছুই রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত। কারণ প্রথম দফার হাওয়া অনেক সময়ই গোটা নির্বাচনের দিক নির্ধারণ করে দেয়। সব মিলিয়ে, ২৩ এপ্রিলের এই পর্ব একেবারে শুরুতেই স্পষ্ট করে দেবে, কার মাটি শক্ত, আর কার সামনে লড়াইটা আরও কঠিন হতে চলেছে।