বিশ্বজিৎ নস্কর, নিজস্ব সংবাদদাতা : দ্বিতীয় দফার ভোটের আগে ফের বাংলার মাটিতে প্রচারের ঝড় তুললেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। পানিহাটির জনসভা শেষ করে সোজা দক্ষিণ ২৪ পরগনার বারুইপুরের টংতলা মাঠে পৌঁছন তিনি। সেখানে বিজেপির যাদবপুর সাংগঠনিক জেলা ও জয়নগর সাংগঠনিক জেলার মোট ১৪ জন প্রার্থীর সমর্থনে এক বিশাল জনসভায় ভাষণ দেন প্রধানমন্ত্রী। সভামঞ্চ থেকে তৃণমূল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে একের পর এক তোপ দাগেন তিনি। তাঁর বক্তব্যে যেমন ছিল রাজনৈতিক আক্রমণ, তেমনই ছিল ভোটের অঙ্ক কষে ভবিষ্যৎ পরিবর্তনের ডাক।

বারুইপুরের সভা ঘিরে সকাল থেকেই এলাকায় ছিল উৎসবের আমেজ। বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বিজেপি কর্মী-সমর্থকরা ভিড় জমান টংতলা মাঠে। হাতে দলীয় পতাকা, গলায় গেরুয়া উত্তরীয়—সব মিলিয়ে একেবারে নির্বাচনী আবহ স্পষ্ট ছিল গোটা এলাকায়। মঞ্চে উঠে প্রধানমন্ত্রী প্রথমেই জনতার উচ্ছ্বাসের প্রশংসা করেন এবং বলেন, এই ভিড়ই প্রমাণ করে দিয়েছে বাংলার মানুষ পরিবর্তনের পক্ষে রায় দিতে প্রস্তুত।
ভাষণের শুরুতেই তিনি প্রথম দফার ভোট নিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন। প্রধানমন্ত্রী দাবি করেন, “বাংলায় প্রথম দফায় বাম্পার ভোট হয়েছে। ৯২.৩৫ শতাংশ রেকর্ড ভোটদান পরিবর্তনের স্পষ্ট ইঙ্গিত। বাংলার সব শ্রেণির মানুষ বিজেপিকে ভোট দিয়েছে।” তাঁর কথায়, এই বিপুল ভোটদানের মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে মানুষের ক্ষোভ এবং পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা। তিনি আরও বলেন, “বাংলার পরিবর্তনে বিজেপিই একমাত্র ভরসা। মানুষ তৃণমূলের অপশাসন থেকে মুক্তি চাইছে।”
এরপরই তৃণমূল কংগ্রেসকে সরাসরি নিশানা করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, গত ১৫ বছরে বাংলার পরিচিতিই নষ্ট করে দিয়েছে বর্তমান সরকার। তাঁর ভাষায়, “তৃণমূলের শাসনে বাংলা ‘মহাজঙ্গলরাজ’-এ পরিণত হয়েছে। যেখানে আইনশৃঙ্খলা বলে কিছু নেই, দুর্নীতি আর সন্ত্রাসই শেষ কথা।” তিনি অভিযোগ করেন, সাধারণ মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন এবং প্রশাসন দলদাসে পরিণত হয়েছে।
আরজি কর-কাণ্ডের প্রসঙ্গ টেনে এনে তিনি রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে নারী-বিরোধী মনোভাবের অভিযোগও তোলেন। মোদীর বক্তব্য, “বাংলার মাটি সবসময় নারী শক্তিকে সম্মান দিয়েছে। কিন্তু আজ সেই বাংলাতেই মহিলারা নিরাপত্তাহীন। তৃণমূল সরকার নারী-বিরোধী।” একইসঙ্গে তিনি দাবি করেন, বাংলার নারী শক্তি এবার ভোটের মাধ্যমে নতুন ইতিহাস লিখতে চলেছে। তাঁর কথায়, “২১ শতকের বাংলা গড়বে মা-বোনেদের শক্তি।”
সভা থেকে প্রধানমন্ত্রী দুর্নীতি ইস্যুতেও তৃণমূলকে কড়া বার্তা দেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, “৪ মে ফলাফল ঘোষণার পর তৃণমূলের গুন্ডারা লুকিয়ে থাকার জায়গা পাবে না। কাউকেই রেহাই দেওয়া হবে না।” তিনি এই হুঁশিয়ারিকে ‘মোদী কি গ্যারান্টি’ বলে উল্লেখ করেন। তাঁর প্রতিশ্রুতি, বিজেপি সরকার গঠন করলেই গত ১৫ বছরের সমস্ত দুর্নীতি, অন্যায় এবং অত্যাচারের হিসাব নেওয়া হবে। একে একে সব ফাইল খোলা হবে এবং দোষীদের শাস্তি নিশ্চিত করা হবে।
প্রধানমন্ত্রী তাঁর ভাষণে কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন প্রকল্পের কথাও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, কেন্দ্র সবসময় বাংলার উন্নয়নের জন্য কাজ করেছে, কিন্তু রাজ্য সরকার সেই উন্নয়নকে আটকে দিয়েছে। তাঁর অভিযোগ, তৃণমূল সরকার রাজনৈতিক স্বার্থে কেন্দ্রের প্রকল্পগুলিকে বাধা দিয়েছে এবং সাধারণ মানুষকে বঞ্চিত করেছে।
এদিনের সভায় বিজেপির প্রার্থীদের সমর্থনে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, “আপনাদের একটি ভোট শুধু সরকার বদলাবে না, বাংলার ভবিষ্যৎ বদলে দেবে।” তিনি দাবি করেন, বিজেপি ক্ষমতায় এলে বাংলায় সুশাসন, উন্নয়ন এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে।
রাজনৈতিক মহলের মতে, বারুইপুরের এই সভা দক্ষিণ ২৪ পরগনায় বিজেপির সংগঠনকে আরও চাঙ্গা করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে। বিশেষ করে যাদবপুর ও জয়নগর সাংগঠনিক জেলার একাধিক আসনে এই জনসভার প্রভাব পড়তে পারে বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
সব মিলিয়ে, দ্বিতীয় দফার ভোটের আগে বারুইপুরের টংতলা মাঠে প্রধানমন্ত্রী মোদীর এই জনসভা কার্যত নির্বাচনী লড়াইকে আরও তীব্র করে তুলল। তৃণমূলের বিরুদ্ধে সরাসরি আক্রমণ, দুর্নীতির বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি এবং পরিবর্তনের ডাক—এই তিনেই ভর করে বিজেপি যে ভোটের ময়দানে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে চাইছে, তা এদিনের সভা থেকেই স্পষ্ট হয়ে গেল। এখন দেখার, এই প্রচারের ঝড় শেষ পর্যন্ত ব্যালট বাক্সে কতটা প্রভাব ফেলে।