চুরির তদন্ত, নাকি তদন্তের নামে নির্যাতন? নিউবারাকপুর থানাকে ঘিরে উঠল এমনই এক গুরুতর অভিযোগ। অভিযোগ, ৮ লক্ষ ৩৫ হাজার টাকা চুরির ঘটনায় তদন্ত করতে গিয়ে এক মা ও তাঁর ছেলেকে থানায় নিয়ে গিয়ে দিনের পর দিন মারধর করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, মায়ের সামনেই ৪৩ বছরের ছেলেকে উলঙ্গ করে মারধর করা হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে পুলিশের বিরুদ্ধে। শরীরের বিভিন্ন জায়গায় রক্ত জমাট বাঁধার দাগ দেখিয়ে নির্যাতনের অভিযোগ করেছেন মা-ছেলে। এই ঘটনায় স্বাভাবিকভাবেই উঠছে একাধিক প্রশ্ন অপরাধের তদন্তের নামে কি কোনও ব্যক্তিকে এভাবে নির্যাতন করা যায়?

ঘটনাটি নিউবারাকপুর থানার লেনিনগড় এলাকার। অভিযোগকারী রিনা মণ্ডল ওই এলাকার বাসিন্দা। স্থানীয় ভাড়াটিয়া নাজিমা বিবি ও তাঁর স্বামী সফিক আলির বাড়িতে রাখি বানানোর কাজ করতেন তিনি। পরিবারের দাবি, গত মাসের ১২-১৩ তারিখ নাগাদ ওই বাড়ি থেকে ৮ লক্ষ ৩৫ হাজার টাকা চুরি যায়। অভিযোগ, বাড়ির দরজা ও শোকেসের তালা ভেঙে টাকা নিয়ে যাওয়া হয়। ঘটনার পরেই চুরির অভিযোগ দায়ের হয় নিউবারাকপুর থানায়। আর সেই অভিযোগের তদন্ত করতে গিয়েই রিনা মণ্ডলের দিকে সন্দেহের তির যায় বলে দাবি। এরপর তাঁকে থানায় নিয়ে গিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। কিন্তু জিজ্ঞাসাবাদের নামে তাঁকে দিনের পর দিন পিসিতে রেখে নির্মম অত্যাচার করা হয়েছে। এমনই গুরুতর অভিযোগ করেছেন রিনা মণ্ডল।

রিনা মণ্ডলের দাবি, চুরির টাকা তাঁর কাছে নেই। কিন্তু পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদের সময় তাঁকে বারবার নির্মম অত্যাচার করা হয় বলে অভিযোগ। পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছয় যে, অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে শেষ পর্যন্ত টাকা পরিশোধ করে দেওয়ার জন্য পুলিশকে অনুরোধ করেছিলেন বলেও দাবি তাঁর। এরপরই তাঁর ছেলে সুজয় বল্লভকে থানায় ডেকে গ্রেফতার করা হয় বলে অভিযোগ। আর ছেলেকে থানায় নিয়ে যাওয়ার পর পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে বলেই দাবি মা ও ছেলের। সুজয় বল্লভের অভিযোগ, তাঁকেও পিসিতে নিয়ে গিয়ে দিনের পর দিন দফায় দফায় নির্মম অত্যাচার করা হয়েছে। তাঁর দাবি, শুধু তাঁকে নয়, তাঁর মাকেও পুলিশ মারধর করেছে। তারপরই তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁকে বারাসাত সরকারি মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে চিকিৎসা করানো হয় বলে অভিযোগ। কিন্তু চিকিৎসার পরেও অত্যাচার থামেনি বলেই দাবি সুজয়ের। তাঁর অভিযোগ, মায়ের সামনেই তাঁকে উলঙ্গ করে নির্মম অত্যাচার করা হয়েছে।
এই গোটা ঘটনার মধ্যে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে ধরেছেন সুজয়। তাঁর দাবি, চুরির ঘটনার সময় অর্থাৎ ৯ থেকে ১৪ তারিখ পর্যন্ত তিনি পুরীতে ছিলেন। সেই দাবির সমর্থনে তাঁর কাছে প্রমাণও রয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি। তাহলে যে সময়ের মধ্যে চুরি হয়েছে বলে অভিযোগ, সেই সময়ে সুজয় যদি নিউবারাকপুরে না-ই থাকেন তাহলে কীভাবে তিনি ওই ঘটনায় জড়িত হতে পারেন এমন প্রশ্নই তুলছে তাঁর পরিবার।
এই ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে সরব হয়েছেন বারাসাত আদালতের আইনজীবী দুলাল সরকারের বক্তব্য, শুধুমাত্র অনুমানের ভিত্তিতে কাউকে পিসিতে নিয়ে গিয়ে নির্মম অত্যাচার করা যায় না। তাঁর দাবি, অভিযোগের আওতায় শুধুমাত্র তদন্তকারী আধিকারিক পরশুরামবাবু এবং তাঁর সঙ্গে থাকা ৪-৫ জন পুলিশকর্মীই নন, থানার আইসি থেকে শুরু করে বারাকপুর পুলিশ কমিশনারেটের উচ্চপদস্থ পুলিশ আধিকারিকদেরও আনার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
আইন হাতে তুলে নেওয়ার অধিকার কারোর নেই। নিউবারাকপুরের এই ঘটনায় এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন একটাই চুরির ৮ লক্ষ ৩৫ হাজার টাকা কোথায় গেল? আর তদন্তের নামে মা ও ছেলের উপর সত্যিই কি চলেছিল নির্মম অত্যাচার? সেই প্রশ্নের উত্তর মিলবে তদন্তেই।