Messi Kolkata Event Probe: ১৩ ডিসেম্বরের পর থেকে কেটে গিয়েছে বেশ কয়েকটা দিন। অনেক জল বয়ে গিয়েছে। কিন্তু কেন ঘটল এমন ঘটনা? আয়োজকদের গাফিলতি তো অবশ্যই অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু মাঠের ভিতরে ঠিক কী কী ঘটেছিল, যার জন্য এভাবে বিশ্বমঞ্চে মুখ পুড়ল বাংলার? কেন সমস্ত দিক আরও মজবুত করা গেল না? যার জন্য হায়দ্রাবাদ সহ বিভিন্ন জায়গার মত কলকাতাতেও মেসিকে দেখাঁ গেল না সেই চেনা ছন্দে।

ক্যানোপি বিতর্ক
ঘটনার দিন স্ট্যান্ড এ১ থেকে মূল ঝামেলার শুরু। মাঠের ধারে যে ক্যানোপি বা তাবু ছিল তার ঠিক পিছনেই ছিল স্ট্যান্ড এ১ আর সেই ক্যানোপির জন্য শুরু থেকেই ভিউ ব্লক হচ্ছিল যারা এখানে ছিলেন। এখান থেকেই প্রথম জলের বোতল ছোড়া হয়েছিল। লোয়ার টিয়ারই প্রথম বিশৃঙ্খলার জায়গা। ক্যানোপি থাকার দরুণ কোন কিছুই দেখা যাচ্ছিল না যারা এখানে বসে ছিলেন তারা শুরু থেকেই জানাচ্ছিলেন কোন কিছুই দেখা যাচ্ছে না এর পর মেসি যখন মাঠে প্রবেশ করেন তখন তাকে ঘিরে যে ভিড় ছিল সেই ভিড় টপকে মেসিকে দেখা হয়ে উঠেছিল সম্পূর্ণ অসম্ভব। একবার ক্যানোপির কাছাকাছি মেসিকে আনা হলেও ভিড়ের জন্য এই স্ট্যান্ড এ১ লোয়ার এবং রাইটের দর্শকরা মেসি দর্শন থেকে বঞ্চিতই থাকেন।
তাণ্ডবের যুবভারতী
ফুটবলে ৪৫ মিনিট করে দু’টি অর্ধে খেলা হয়। মেসিকে ঘিরে যুবভারতীতেও শনিবার দু’টি হাফ ছিল। প্রথমটি ২২ মিনিটের, পরেরটি ৬৩ মিনিটের। ২২ মিনিট জুড়ে ছিল ‘উৎসব’। আর ৬৩ মিনিটের পুরোটাই তাণ্ডব। মেসি মাঠে ঢোকেন সকাল সাড়ে ১১টা নাগাদ।১১টা ৫০ নাগাদ বিরক্ত হয়ে বেড়িয়ে গেলেন। এই ২০ মিনিট তাঁকে ঘিরে ছিলেন অরূপের বিশ্বাস সহ আরও বহু মানুষ, কিন্তু যাঁকে দেখতে জনতা হাজার হাজার টাকা খরচ করে মাঠে এল, তিনিই ঢাকা পড়ে গেলেন! ক্যানোপির পিছন থেকে বারবার অনুরোধ করা হয় মেসির সঙ্গে থাকা ভিড় সরানোর জন্য কিন্তু কোথায় কি! মেসির গাড়ি মাঠ ছেড়ে বেড়িয়ে বাইপাস ছোঁয়ার আগেই শুরু তাণ্ডব। বেলা ১টা নাগাদ সেই তাণ্ডব খানিক স্তিমিত হয়। গোটা যুবভারতী সাক্ষী যে, প্রথম ২২ মিনিট মেসিকে নিয়ে পাড়ার স্তরের অব্যবস্থা যদি না হত, পরের ৬৩ মিনিট ঘটতই না।তাহলে মেসিও হয়ত মাঠ প্রদর্শন করতেন হাসতেন খেলতেন অর্থাৎ তাকে তার মত করে ছেড়ে না দেওয়াও এই গ্ণডগোলের অন্যতম কারণ

ছিল না ইভেন্টের গতি
এই ধরনের বড় আয়োজনে প্রতি মিনিটের পরিকল্পনা আগে থেকে ছকে রাখা হয়, যাকে পেশাদারি ইংরেজি পরিভাষায় বলা হয় ‘মিনিট টু মিনিট ইভেন্ট ফ্লো’। মেসির যুবভারতীর অনুষ্ঠানের জন্য নাকি ছিল না এমন কোনও পরিকল্পনা সাধারণত এটা অনেক আগেই তৈরি হয়ে যায়। দর্শকদের টিকিটের পিছন দিকে সময় ধরে ধরে উল্লেখ থাকে অনুষ্ঠানে কী কী হবে। পরিকল্পনাহীন এই অনুষ্ঠানে তেমন কিছুই ছিল না। যুবভারতীতে আগের দিন কোনও মহড়াও হয়নি! বিশ্বমানের ফুটবল তারকাদের জনসমক্ষে নিয়ে আসার মতো ‘মেগা ইভেন্ট’-এ যে ন্যূনতম পেশাদারিত্বের প্রয়োজন ছিল, তা দেখাননি আয়োজক-উদ্যোক্তাদের কেউই। অথচ শুধু মেসি-সুয়ারেজ়রাই নন, অনুষ্ঠানে থাকার কথা ছিল মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, শাহরুখ খান, সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়দের। তাঁদের নিয়ে একটি খসড়া অনুষ্ঠানসূচি ছিল বটে, কিন্তু মেসি কখন আসবেন, দাঁড়াবেন না হাঁটবেন, কী ভাবে দর্শকদের মুখোমুখি হবেন, কী করবেন, তার কোনও পরিকল্পনা ছিল না। কেউ কিছুই জানতেন না।
মেসির নিরাপত্তার অভাব বোধ স্বয়ং নিরাপত্তীরক্ষীদের
বেলা সাড়ে ১১টা নাগাদ যুবভারতীর চার এবং পাঁচ নম্বর গ্যালারির মাঝখানের পথ দিয়ে মেসির গাড়ি এসে থামল যুবভারতীর অ্যাথলেটিক ট্র্যাকের সামনে। মেসি গাড়ি থেকে নামতেই তাঁকে ঘিরে ফেলেন শ’খানেক মানুষ— কারা ছিল সেই ভিড়ে? উদ্যোক্তা, ফোটোশিকারি, নেতা, মন্ত্রী এবং তাঁদের চ্যালাচামুন্ডারা। প্রভাবশালীদের ভিড় ঘিরে থাকে মেসির সঙ্গে ছবি তোলার চেষ্টায় শুরু হয়ে যায় ধাক্কাধাক্কি। একে অন্যকে সরানোর চেষ্টা বা ধাক্কাই শুধু নয়, মরিয়া সেলফিশিকারিদের একজনের কনুই গুঁতো মারে লুইস সুয়ারেজ়ের পেটে। কোনও একজনের নখে ছড়ে যায় রদ্রিগো ডি’পলের হাত। মুখে হাসি বজায় রাখার চেষ্টা করলেও, অস্বস্তি অনুভব করতে থাকেন মেসি। পরিস্থিতি বেগতিক, বুঝে গিয়েছিলেন মেসির নিরাপত্তারক্ষীরাও। তাঁরা আর ঝুঁকি নেননি। দ্রুত মেসিদের সরিয়ে নিয়ে যান মাঠ থেকে।
প্রশাসন-শতদ্রু সমন্বয়ের অভাব
অব্যবস্থা যে আছে তার আভাস নাকি অনুষ্ঠানের আগের দিনই টের পেয়ে গিয়েছিলেন স্বয়ং ক্রীড়ামন্ত্রী। শতদ্রুদের সঙ্গে অনুষ্ঠানের সূচি নিয়ে আলোচনার জন্য শুক্রবার দুপুর ১টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত যুবভারতীতে বসে ছিলেন অরূপ। কিন্তু শতদ্রুকে পাওয়াই যায়নি। বিষয়টিকে গুরুত্বই দেননি উদ্যোক্তারা। প্রশাসনের সঙ্গেও পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনার প্রয়োজন আছে বলে তাঁরা মনে করেননি। কেন্দ্র এবং রাজ্যের দুই নিরাপত্তাবাহিনীর মধ্যে কোনও সমন্বয়ও লক্ষ করা যায়নি। প্রশাসনের সঙ্গে ক্রীড়া দফতর বা আয়োজক শতদ্রুদের যে কোনও সমন্বয় ছিল না, তা-ও স্পষ্ট হচ্ছে ক্রমশ। আরও আছে। অব্যবস্থা এতটাই যে, অনুষ্ঠানের অন্যতম প্রধান স্পনসরের কাছে শুক্রবার রাত পর্যন্ত পৌঁছোয়ইনি ভিআইপি কার্ড।

সিটের জেরায় কী জানালেন স্বয়ং শতদ্রু?
যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে কয়েক জন লিওনেল মেসির সঙ্গে প্রায় গা ঘেঁষাঘেঁষি করার পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিলেন। এই বিষয়টি পছন্দ করছিলেন না ফুটবল তারকা নিজে। মাঠের মধ্যে লোকজনের প্রায় গা ঘেঁষাঘেঁষি করার পর্যায়ে পৌঁছে যাওয়া মেসিও পছন্দ করছিলেন না। সিটের আধিকারিকদের এমনটাই জানিয়েছেন শতদ্রু। তদন্তকারীদের শতদ্রু আরও জানান, মেসি যখন বিরক্ত হয়ে যাচ্ছিলেন, তখন তিনি মাঠ থেকেই ঘোষণা করছিলেন যাতে ফুটবল তারকাকে ওই ভাবে ঘিরে ধরা না হয়। কিন্ত তার কথা শোনা হয়নি কিন্তু যদি তার কথা শোনা না হয়েই থাকে কেন শোনা হল না? কেন মিনিট টু মিনিটস ইভেন্ট ফ্লো তিনি তৈরি করে রাখেননি? কেন সেদিন প্রভাবশালী দের ভিড় এবং সেই সঙ্গে বাড়তি ভিড় আটকাতে পারেননি তিনি? নাকি এই আটকাতে না পারা খানিকটা ইচ্ছেক্রিতই? কারণ আগামীতে তাকে তো এই বাংলাতে কাজ করে খেতে হবে? তাই কাউকেই কি চটাতে চাননি শতদ্রু? এখনও অধরাই এই সমস্ত প্রশ্নের উত্তর।