তৃণমূল থেকে বহিষ্কার হওয়ার পরেও এতটা খারাপ সময় আসেনি হুমায়ুন কবীরের। বিজেপি জমানায় একেবারে বোতলবন্দি হতে হল রেজিনগরের বাঘকে। যে রেজিনগর ছিল আপন ঘর সেখানেই উপনির্বাচনে কুপোকাৎ হতে হল হুমায়ুনকে। তবে কি রেজিনগরের সংখ্যালঘুদের বিশ্বাস জিততে পেরেছে বিজেপি। কেন সংখ্যালঘুরা হাত ছাড়লেন হুমায়ুন কবীরের। তবে কি রেজিনগরে বিজেপির কিস্তিমাতের পিছনে শুভেন্দু অধিকারীর সেই বিশাল প্যাকেজ। আর তা আন্দাজ করে সংখ্যালঘুদের বিশ্বাস ধরে রাখতে দোয়া চেয়ে ২৭৪ টি মসজিদে চিঠি পাঠিয়েছিলেন হুমায়ুন কবীর। কিন্তু শেষরক্ষা যে হল না। তবে কি এবার হারের দুঃখ ভুলতে দুবাইবাসী হচ্ছেন হুমায়ুন কবীর।

রেজিনগর উপনির্বাচনে চাপ যে বাড়ছে তা ভালো ভাবেই টের পেয়েছিলেন হুমায়ুন কবীর। কিন্তু ময়দান তিনি ছাড়েননি। ভোটের নির্ঘন্ট প্রকাশের অনেক আগে থেকেই ভোটের ময়দানে ছিলেন তিনি। প্রচার থেকে দেওয়াল লিখন সবেতেই তিনি ছিলেন এগিয়ে। খাতায় কলমে প্রার্থী হিসাবে তাঁর ছেলে গোলাম নবি আজাদের নাম থাকলেও লড়াইয়ে ছিলেন হুমায়ুন কবীরই। ভোট আবহে তাঁর বিভিন্ন সময়ে বাধার মুখে পড়তে হয়েছে তারপরেও দাঁত কামড়ে পড়েছিলেন তিনি। খারাপ সময়ে জেতা আসন হাতছাড়া করতে চাননি হুমায়ুন। কিন্তু সংখ্যালঘু সমর্থন ধরে রাখতে ব্যর্থ হলেন তিনি। নওদা নিয়ে খুশি থাকতে হবে তাঁকে। কিন্তু কোন ইকুশনে সংখ্যালঘু বেল্টে বাজিমাৎ করল সেটা নিয়ে একটু বিশ্লেষণ করা দরকার। তবে তার আগে হুমায়ুনের একটি মন্তব্যে অন্য গন্ধ নাকে পাচ্ছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। সম্প্রতি হুমায়ুনের মুখে শোনা গেছে গদ্দারি শব্দটি। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর দিকে যেমন আঙুল তুলেছেন তেমনি নিজের ছেলের দিকেও অভিযোগের আঙুল তুলেছেন তিনি। ছেলেও নাকি গদ্দারি করেছে তাঁর সঙ্গে। ঘরে বাইরে সমালোচিত হুমায়ুন কবীর। সেদিন তো চোখের জলে নাকের জলে দুঃখ প্রকাশ করে রাজনীতি ছাড়ার কথাও বলতে শোনা গিয়েছিল তাঁকে।

এবার আসি কোন ইকুয়েশনে সংখ্যালঘুদের মন জিতল বিজেপি। বিজেপি নাকি সংখ্যালঘু বিরোধী এই প্রবাদই শোনা যেত। কী এমন হল যে বিজেপির জয়ে আবির নিয়ে উচ্ছ্বাসে মেতে উঠলেন সংখ্যালঘুরা। রেজিনগর এমন একটি বিধানসভা কেন্দ্র একক কোনো ব্যক্তি বা দল বরাবর জেতেনি, তবে বিগত নির্বাচনগুলোতে মূলত রবিউল আলম চৌধুরী এবং হুমায়ুন কবির-এর মধ্যে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা সীমাবদ্ধ ছিল। ২০১৬ রবিউল আলম চৌধুরী ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের হয়ে জিতেছিলেন এই আসন।২০২১ আসনে এই রবিউল আলম চৌধুরী তৃণমূল কংগ্রেসের হয়ে জয় ধরে রাখেন। ২০২৬ বিধানসভা ভোটে এই আসনে জয় পান হুমায়ুন কবীর। যাতা জয় নয় বেশ ভালো ভোটেই জয় পান তিনি। রেজিনগর মূলত সংখ্যালঘু অধ্যুষিত আসন। প্রায় ৭০ শতাংশ সংখ্যালঘু ভোটার অধ্যুষিত, যার ফলে এই অঞ্চলে সংখ্যালঘু ভোট যেকোনো রাজনৈতিক দলের জয়ের ক্ষেত্রে প্রধান ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করে। তাই সংখ্যালঘু ভোট পকেটে পুরতে হুমায়ুন কবীর যেমন ঝাঁপিয়ে ছিলেন তেমনি বিজেপিও পাখির চোখ করেছিল রেজিনগর আসনকে। তাই তো রেজিনগরে ভরা মঞ্চ থেকে যখন হুমায়ুন কবীর চাঁচাছোলা ভাষায় শুভেন্দু অধিকারী ও বিজেপিকে আক্রমণ করেছিলেন তখন বিধানসভা থেকে আল্টিমেটাম দিতে ভোলেননি মুখ্যমন্ত্রী। কয়েকদিনের মধ্যে মুর্শিদাবাদে গিয়ে রেজিনগরের জন্য বিশেষ প্যাকেজের কথা ঘোষণা করেন শুভেন্দু অধিকারী।
কী সেই বিশেষ প্যাকেজ। রেজিনগর এলাকায় নতুন শিল্প প্রতিষ্ঠান স্থাপন, যুবকদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং প্রয়োজনীয় এলাকায় নতুন সেতু ও কলেজ নির্মাণ করা হবে।একটি বিশেষ প্যাকেজের মাধ্যমে নদী ভাঙন রোধে স্থায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করার কথা বলা হয়েছে। নারীদের স্বনির্ভর করতে বিশেষ প্রকল্পের সুবিধা এই অঞ্চলে পৌঁছে দেওয়া হবে বলে ঘোষণা করেন শুভেন্দু অধিকারী। এখানেই শেষ নয় নন্দীগ্রাম ও রেজিনগরে উপনির্বাচনে প্রচারে গিয়ে সংখ্যালঘুদের উদ্দেশ্যে দেন নানা বার্তা। কখনও বলছেন ৭০-৩০ শতাংশের খেলা বন্ধ করে, হিন্দু-মুসলিম আলাদা না ভেবে সংখ্যালঘু ও সংখ্যাগরিষ্ঠ সবাইকে একসঙ্গে দেখার কথা। কখনও বলেছেন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে মুখ ফিরিয়ে না রেখে বিজেপির সঙ্গে হাত মিলিয়ে বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ার কথা । তবে কি সেই বন্ধুত্বের বার্তাতেই কিস্তিমাত নাকি কোনও অপশনই ছিল না ভোটারদের কাছে। কারণ যে ভাবে একের পর এক ঘটনায় হুমায়ুন কবীরকে ঘিরে ফেলা হচ্ছিল তাতে করে ভোটারদের কাছে হয়তো বার্তাটা স্পষ্ট ছিল বিজেপি ক্ষমতায় সেখানে উন্নয়নের প্রশ্নে শেষ কথা শুভেন্দু অধিকারী। এছড়াও অনেকের মতে নির্বাচনের প্রচারের শেষ দিকে হুমায়ুন কবীরের আলটপকা মন্তব্য, প্রচার না করার সিদ্ধান্ত সবটাই কি হুমায়ুনের পথ আটকালো। না হলে এই আসন থেকে মাস কয়েক আগে ৫৯ হাজার ভোটে জিতেছিলেন হুমায়ুন , সেই আসনেই তাঁকে হারতে হল।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা আরও একটি দাবি করছেন বিরোধী ভোটে ভাগাভাগি। যেটা বুঝতে পেরেই বিরোধীদের একজোট হয়ে বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের বার্তা দিয়েছিলেন হুমায়ুন কবীর। কিন্তু হুমায়ুন কবীরের জোট বার্তা কেউ কানে তোলেনি। ১৪ জন প্রার্থী লড়েছেন এই আসনে ৷ লড়াইয়ে ছিল বিজেপি, মমতা সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস, গণতান্ত্রিক তৃণমূল কংগ্রেস, কংগ্রেস, সিপিএমের প্রার্থীরা৷ এমনকি ছ জন নির্দল প্রার্থীও ভোটে লড়াই করে ৷ যার ফলে ভোট কাটাকুটির খেলাও চলেছে এই আসনে। এই আসনে মোট ভোটার ২ লক্ষ ৫৬ হাজার ৫৪৬ জন ভোটার । এর মধ্যে পুরুষ ভোটারের সংখ্যা ১ লক্ষ ৩৩ হাজার ৯২৫ জন । মহিলা ভোটার ১ লক্ষ ২২ হাজার ৬১৬ জন । এই সংখ্যা কেন বলছি বলুন। সোশ্যাল মাধ্যমে একটি ট্রেন্ড চলেছে অন্নপূর্ণা প্রকল্পের সুবিধা না পাওয়ায় বিজেপির থেকে মহিলারা মুখ ফেরাচ্ছেন। বিশেষ করে সংখ্যালঘু মহিলারা। সেটা যদি হত রেজিনগরে বিজেপির ভোট প্রাপ্তিতে প্রভাব পড়ত।
এদিকে বিজেপি যখন রেজিনগরে বিপুল ভোটে জয় নিয়ে কাঁধ চাপড়াচ্ছে তখন একি অভিযোগ করেছেন তৃণমূল সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় দাবি করেছেন যে, রেজিনগর বিধানসভা কেন্দ্রের ১০৯ নম্বর বুথে মোট নথিভুক্ত ভোটার ছিলেন ৭৭২ জন, অথচ সেখানে বিজেপি একাই ৯০৯টি ভোট পেয়েছে। নির্বাচন কমিশনকে নিশানা করে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন মোট ভোটারের চেয়ে কীভাবে বেশি ভোট একটি রাজনৈতিক দল পেল। তবে যাই হোক সব বিতর্ক ছাপিয়ে রেজিনগরে পদ্ম ফুটেছে। রেজিনগরে হুমায়ুন কবীরের বারা ভাতে ছাই ফেলল বিজেপিই। দ্বিতীয় আসনে পেয়ে যেন সান্তনা পুরস্কার জুটল হুমায়ুনের ছেলের কপালে। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে রেজিনগর কেন্দ্র থেকে আম জনতা উন্নয়ন পার্টির প্রধান হুমায়ুন কবির ১,২৩,৫৩৬ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছিলেন। বিজেপির বাপন ঘোষ পেয়েছিলেন ৬৪,৬৬০ ভোট এবং তৃণমূলের আতাউর রহমান পেয়েছিলেন ৪১,৭১৮ ভোট। অর্থাৎ, আগের নির্বাচনে বিজেপি দ্বিতীয় স্থানে থাকলেও জয়ী প্রার্থীর সঙ্গে তার ব্যবধান ছিল উল্লেখযোগ্য। যা ফ্যাক্টর হয়েছে উপনির্বাচনে। তাই অনেকেই বলছেন রেজিনগরের মতো সংখ্যালঘু বেল্টে এত বড় ব্যবধানে জয় শুভেন্দু অধিকারীর মাস্টারস্ট্রোক।