জাতীয় পতাকা হাতে প্রতিবাদ, আর তার পরেই গ্রেফতারি। রাজধানী দিল্লির যন্তর মন্তরকে ঘিরে এবার সামনে এল এমনই এক ঘটনা, যা নিয়ে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক বিতর্ক। পুলিশি নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ব্যারিকেড টপকে যন্তর মন্তরে প্রবেশ, জাতীয় পতাকা উত্তোলন এবং মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে স্লোগান দেওয়ার অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়েছে ককরোচ জনতা পার্টি বা সিজেপির দুই নেতা আশুতোষ রাঙ্কা ও সৌরভ দাসকে। বুধবার ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে পেশ করা হলে তাঁদের পাঁচ দিনের বিচারবিভাগীয় হেফাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়। অন্যদিকে, এই ঘটনায় ধৃত দলের আরও এক নেতা অজিঙ্ক শিন্ডেকে শান্তি বজায় রাখার শর্তে বন্ডে সই করিয়ে মুক্তি দেওয়া হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। ঘটনাকে কেন্দ্র করে দিল্লি পুলিশের ভূমিকা এবং প্রতিবাদের অধিকার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে সিজেপি।

ঘটনার সূত্রপাত যন্তর মন্তরে প্রতিবাদ কর্মসূচিকে ঘিরে জারি হওয়া নিষেধাজ্ঞা থেকে। দিল্লি পুলিশের নির্দেশ অনুযায়ী, যন্তর মন্তরে আর কোনও প্রতিবাদ সভা বা বিক্ষোভ কর্মসূচি করা যাবে না। তার পরিবর্তে আন্দোলনকারীদের জন্য বিকল্প হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে রামলীলা ময়দান, উত্তর দিল্লির বুরারি ময়দান ও পূর্ব দিল্লির সিবিডি ময়দান। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের অধীনে থাকা দিল্লি পুলিশের এই সিদ্ধান্তের পরেও যন্তর মন্তরেই প্রতিবাদ কর্মসূচি চালানোর পরিকল্পনা করে সিজেপি। দলের দাবি, এসআইআর সংক্রান্ত অভিযোগ এবং মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেই তাদের এই আন্দোলন।

এর পরেই মঙ্গলবার সকালে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। অভিযোগ, পুলিশের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে সিজেপির তিন নেতা ব্যারিকেড টপকে যন্তর মন্তরে প্রবেশ করেন। তাঁদের সঙ্গে কয়েক জন দলীয় সমর্থকও ছিলেন। ভিতরে ঢুকে জাতীয় পতাকা মেলে ধরেন তাঁরা এবং মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে স্লোগান দিতে শুরু করেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘটনাস্থলে পৌঁছে তাঁদের আটক করে দিল্লি পুলিশ। মঙ্গলবার রাতের দিকে এই ঘটনায় আশুতোষ রাঙ্কা, সৌরভ দাস ও অজিঙ্ক শিন্ডে-সহ মোট ১৪ জনকে আটক করার খবর সামনে আসে। পরে বুধবার ভোরে সিজেপির আইনবিষয়ক প্রধান রত্না সিংহ জানান, দলের তিন নেতাকে গ্রেফতার করে থানায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। যদিও দিল্লি পুলিশের তরফে এই পদক্ষেপকে আগাম সতর্কতামূলক বা প্রতিরোধমূলক গ্রেফতারি হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
বুধবার সকাল আটটা নাগাদ আশুতোষ ও সৌরভকে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে পেশ করা হয়। সেখানে পুলিশ এবং অভিযুক্তদের আইনজীবীদের মধ্যে সওয়াল-জবাব চলে। পুলিশের অভিযোগ, বিনা অনুমতিতে যন্তর মন্তরে প্রবেশ করেছিলেন ওই নেতারা। শুধু তাই নয়, তাঁদের বিরুদ্ধে জারি থাকা নিষেধাজ্ঞা অমান্য করা, সরকারি কর্মীদের কাজে বাধা দেওয়া ও শান্তি বজায় রাখার শর্ত ভঙ্গের অভিযোগও আনা হয়েছে। পুলিশের দাবি, আশুতোষ ও সৌরভ ফোন করে যন্তর মন্তরে লোক জড়ো করেছিলেন। তাঁদের মুক্তি দিলে ফের একই ধরনের ঘটনা ঘটতে পারে বলেও আদালতে যুক্তি দেয় পুলিশ। এই সমস্ত অভিযোগ ও যুক্তির পরিপ্রেক্ষিতে আশুতোষ রাঙ্কা ও সৌরভ দাসকে পাঁচ দিনের বিচারবিভাগীয় হেফাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেন ম্যাজিস্ট্রেট।
অন্যদিকে, ধৃত অজিঙ্ক শিন্ডেকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে। সূত্রের খবর, শান্তিভঙ্গ না করার শর্তে বন্ডে সই করার পর তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়। সিজেপির আইনজীবী অভীষ্ট হেলার বক্তব্য, আদালতে দিল্লি পুলিশের তরফে যে দাবি করা হয়েছে, তা নিয়ে তাঁদের আপত্তি রয়েছে। দলের দাবি, যন্তর মন্তরে জমায়েতের ডাক দেওয়া হয়েছিল বলে পুলিশের যে অভিযোগ তা সঠিক নয়। পুলিশের বক্তব্যের সঙ্গে একমত নয় সিজেপি। আশুতোষ ও সৌরভকে পাঁচ দিনের হেফাজতে পাঠানোর সিদ্ধান্তের পর সরব হয়েছেন সিজেপি প্রধান অভিজিৎ দীপকে। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, তাঁদের অপরাধটা ঠিক কী? যন্তর মন্তরে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করাই কি তাঁদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপের কারণ? এক্স হ্যান্ডেলে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে উদ্দেশ করে দীপকে লেখেন, দোষ শুধু তেরঙ্গা ওড়ানো। হিম্মত থাকলে মোদিজি, এমার্জেন্সি ঘোষণা করুন। তাঁর অভিযোগ, ভিন্নমতকে দমন করার জন্য এই ধরনের পদক্ষেপ করা হচ্ছে।
এই ঘটনা অবশ্য একেবারে বিচ্ছিন্ন নয়। এর আগেও গত ১০ অক্টোবর দিল্লি বিমানবন্দরে নামার পর অভিজিৎ দীপকে, আশুতোষ রাঙ্কা ও সৌরভ দাসদের প্রতিরোধমূলক গ্রেফতারির মুখে পড়তে হয়েছিল। পরে আদালতের নির্দেশে শান্তি বজায় রাখার শর্তে তাঁরা মুক্তি পান। যন্তর মন্তরে প্রতিবাদ কর্মসূচি বন্ধ করার নির্দেশের পাশাপাশি বিকল্প বিক্ষোভস্থলগুলির ব্যবস্থাও সামনে এনেছে প্রশাসন। তার মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত রামলীলা ময়দান। সেখানে প্রতিবাদ কর্মসূচি আয়োজনের খরচও কম নয়। দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মাঠ বুকিং, নিরাপত্তা জামানত ও কর মিলিয়ে মোট খরচ প্রায় ১ লক্ষ ২১ হাজার টাকা হতে পারে। এর মধ্যে প্রায় ৫৫ হাজার টাকা ফেরতযোগ্য জামানত ও বাকি প্রায় ৬৬ হাজার টাকা ফেরত পাওয়া যাবে না। বুরারি ময়দান ও সিবিডি ময়দানকেও বিকল্প হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ফলে প্রতিবাদস্থল পরিবর্তনের নির্দেশ শুধু রাজনৈতিক আন্দোলনের জায়গা বদল নয় আয়োজকদের খরচ ও প্রস্তুতির ক্ষেত্রেও নতুন প্রশ্ন তুলে দিচ্ছে। আপনার কী মনে হয় জাতীয় পতাকা তুলে প্রতিবাদ করায় এই গ্রেফতারি কি যুক্তিসংগত? নাকি প্রতিবাদের অধিকার খর্ব হচ্ছে।