একদিকে দিল্লিতে চলছে কেন্দ্রী বিরোধী আন্দোলন। অন্যদিকে চলছে কেন্দ্রীয় মন্ত্রীসভার রদবদলের জল্পনা। এরই মাঝে ইস্তফা দিলেন এক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী। এর আগে ইস্তফা দিয়েছিলেন শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান।তবে সেখানে প্রশ্নফাঁস কেলেঙ্কারিকে ঘিরে সিজেপির আন্দোলনে সহ বেশকিছু ইস্যু ছিল। তবে কেন্দ্রীয় তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী এল মুরুগানের ইস্তফার কারন ঠিক কি? তিনি নাকি এই বিষয়ে প্রধামমন্ত্রীকে লম্বা চিঠিও দিয়েছেন।

তথ্য ও সম্প্রচার এবং সংসদ বিষয়ক কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী এল মুরুগানের পদত্যাগ নিয়ে এখন জোর জল্পনা রাজনৈতিক মহলে। মঙ্গলবার তাঁর উভয় মন্ত্রিত্বের পদ ও রাজ্যসভার সদস্যপদ থেকে ইস্তফা দেন।এই বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে চিঠিও লেখেন তিনি। চিঠিতে তিনি জানিয়েছেন, “ভারত মাতা” ও তামিলনাড়ুর সেবা করা তাঁর কাছে “সর্বোচ্চ সম্মানের।” মন্ত্রীর কথায়, “বিনম্র ও কৃতজ্ঞ চিত্তে আমি আপনার কাছে অনুরোধ জানাচ্ছি যেন আমাকে প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয় এবং রাজ্যসভার সদস্যপদ ত্যাগ করার অনুমতি দেওয়া হয়, যাতে আমি তামিলনাড়ুতে দলকে শক্তিশালী করার কাজে পূর্ণ সময় দিতে পারি।”সমাজমাধ্যমে তিনি আরও লিখেছেন, “দিনমজুরের সন্তান হিসেবে জীবন শুরু করে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিজির নেতৃত্বে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় দায়িত্ব পালন করা আমার জীবনের এক পরম সৌভাগ্য। এখন আমি তৃণমূল স্তরে ফিরে যেতে চাই ; আমাদের দলীয় কর্মীদের পাশে দাঁড়াতে এবং ২০২৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের আগে তামিলনাড়ুতে বিজেপিকে শক্তিশালী করার কাজে নিজেকে পূর্ণ সময়ের জন্য নিয়োজিত করতে চাই।”
মুরগানের ইস্তফার বিষয়ে আরও একটি জল্পনা জোড়ালো হচ্ছে। সোমবারই একাধিক রাজ্যের রাজ্যপাল বদলে সিলমোহর দিয়েছিলেন রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু। সেই সঙ্গেই জোড়ালো হয় কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় রদবদলের জল্পনা। মুরুগানের ইস্তফার পরে তা আরও জোরাল হয়েছে। তবে মুরুগান স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, সাংগঠনিক প্রয়োজনে তিনি দিল্লির দায়িত্ব ছেড়ে নিজের রাজ্যে ফিরে যাচ্ছেন তিনি। তামিল রাজনীতি থেকে মুরুগানের উত্থান হলেও তিনি মধ্যপ্রদেশ থেকে রাজ্যসভার সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন। সারা দেশে বিজেপির শক্তি বাড়লেও দক্ষিণ ও পূর্ব ভারতের বেশ কয়েকটি রাজ্য এবং আঞ্চলিক দলগুলোর শক্তিশালী আধিপত্য থাকা অঞ্চলগুলোতে ভারতীয় জনতা পার্টির রাজনৈতিক মাটি বা সাংগঠনিক ভিত্তি তুলনামূলকভাবে দুর্বল। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচন এবং পরবর্তী রাজ্যভিত্তিক রাজনৈতিক সমীকরণে এই দুর্বলতাগুলো আরও স্পষ্ট হয়েছে। বিক্ষিপ্ত ভাবে কর্নাটকে সরকার গড়লেও, তা সেই ভিত খুব মজবুত ছিল না। বিজেপি অনেক দিন ধরেই তামিলনাড়ু, কেরল, তেলঙ্গানার মতো রাজ্যগুলিতে শক্তি বৃদ্ধিতে চেষ্টা করছে। বিজেপি সূত্রে খবর, রাজ্য সংগঠনকে মজবুত করতেই মুরুগানকে তামিলভূমে পাঠিয়ে দেওয়া হল।
প্রশ্ন হচ্ছে যদি সত্য়িই রাজ্য সংগঠনকে মজবুত করতে মুরুগানকে তামিলনারুচে পাঠিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়ে থাকে,তাহলে এল মুরুগানের ওপরই কেন এত ভরসা শীর্ষ নেতৃত্বের। এল মুরুগান হলেন তামিলনাড়ুর বিজেপি-র অন্যতম প্রভাবশালী ও শীর্ষস্থানীয় নেতা। রাজনীতির অলিন্দে বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ও আস্থাভাজন হিসেবেই পরিচিত তিনি। ২০২১ সালের ৭ জুলাই থেকে তিনি কেন্দ্রের মন্ত্রী। কেন্দ্রীয় সরকারে যোগ দেওয়ার আগে তিনি তামিলনাড়ু রাজ্য বিজেপির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন এবং একসময় পার্শ্ববর্তী রাজ্য কেরলেও দলের সংগঠনের দায়িত্ব সামলানোর অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর।দীর্ঘ সময় ধরে তিনি রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের তফশিলি জাতি সেলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে তৃণমূল স্তরে কাজ করেছেন। ২০১১ সালের তামিলনাড়ু বিধানসভা নির্বাচনে প্রথমবার বিধায়ক হিসেবে জয়লাভ করে তিনি তাঁর রাজনৈতিক সাফল্যের প্রথম বড় পদক্ষেপে পৌঁছোন। মূলত বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের অত্যন্ত দক্ষ সংগঠক হিসেবেই পরিচিত মুরুগান এবার দিল্লি ছেড়ে নিজের রাজ্য তামিলনাড়ুতে দলের ভিত আরও শক্ত করতেই সর্বাত্মক লড়াইয়ে নামার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
তবে রাজনৈতিক মহলের মতে নামিলনাড়ুতে বিজেপ মাটি শক্ত করা এল মুরগানের জন্য বেশ চ্যালেঞ্জিং।কারন থালাপতি বিজয়। তাই তামিলনাড়ুতে অভিনেতা সি. জোসেফ বিজয়ের দল তামিলগা ভেট্টি কাজাগাম (TVK)-এর উত্থান এবং ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে দলটির ঐতিহাসিক জয়ের পর, সেখানে বিজেপির মাটি শক্ত করা এল. মুরগানের জন্য অত্যন্ত কঠিন এবং বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জিং একটি কাজ।বিশেষ করে, ২০২৬ সালের অক্টোবরে ভারতের কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রীর পদ এবং রাজ্যসভার সদস্যপদ থেকে ইস্তফা দিয়ে মুরগান যখন সরাসরি তামিলনাড়ুর তৃণমূল স্তরে দলের হাল ধরতে ফিরে এসেছেন, তখন তাঁর সামনে বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জগুলো হল-২০২৬ সালের নির্বাচনে ১০৮টি আসন জিতে এবং পরবর্তীতে উপ-নির্বাচনেও দাপুটে জয় ধরে রেখে বিজয় তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে নিজের অবস্থান পোক্ত করেছেন। রাজ্যের ৪২% তরুণ ও মহিলা ভোটাররা বিজেপির দিকে না গিয়ে বিকল্প হিসেবে বিজয়ের TVK-কে বেছে নিয়েছে। এই শক্তিশালী তরুণ ও প্রগতিশীল ভোটারদের বিজেপির দিকে টানা মুরগানের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।তামিলনাড়ুর রাজনীতি দীর্ঘ ৫৯ বছর ধরে ডিএমকে এবং এআইএডিএমকে র দ্বিমেরু রাজনীতিতে বন্দি ছিল। বিজেপি এত দিন সেখানে এআইএডিএমকে-র কাঁধে ভর দিয়ে বা দ্রাবিড় বিরোধী ভোটব্যাঙ্ক নিজেদের দিকে আনার চেষ্টা করছিল। কিন্তু TVK-এর জমানায় সমীকরণ সম্পূর্ণ বদলে গেছে। একদিকে ক্ষমতাসীন ধর্মনিরপেক্ষ সামাজিক ন্যায়বিচার জোট অন্যদিকে ঐতিহ্যবাহী ডিএমকে ও দুর্বল হয়ে পড়া এআইএডিএমকে এবং তার মাঝে বিজেপির নিজস্ব জায়গা তৈরি করা মুরগানের জন্য বিশাল চ্যালেঞ্জ।
শুধু এই নয় রয়েছে আরও বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ কারন।বিজয়ের TVK ধর্মনিরপেক্ষতা, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং সমতাবাদের আদর্শ নিয়ে রাজনীতি করছে, যা তামিলনাড়ুর চিরাচরিত দ্রাবিড়ীয় ভাবধারার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। বিজেপির সনাতন বা হিন্দুত্ববাদী রাজনীতিকে তামিল সমাজ সহজে গ্রহণ করতে চায় না। সম্প্রতি তিরুভাল্লুভারের গেরুয়া চিত্রায়ণ নিয়ে TVK ও বিজেপির যে প্রকাশ্য বিরোধ তৈরি হয়েছে, তা প্রমাণ করে যে তামিল ভাবাবেগকে আঘাত না করে বিজেপির জাতীয়তাবাদী এজেন্ডা সেখানে প্রতিষ্ঠা করা কতটা কঠিন।মুরগান কেন্দ্রীয় মন্ত্রিত্ব ছেড়েছেন মূলত ২০২৯ সালের লোকসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে গ্রাসরুট বা তৃণমূল স্তরে বিজেপির সাংগঠনিক ভিত মজবুত করতে। তামিলনাড়ুর বুথ স্তরে বিজেপির সাংগঠনিক শক্তি এখনও অত্যন্ত দুর্বল। অন্যদিকে বিজয়ের বিশাল ফ্যান ক্লাব নেটওয়ার্ক রাতারাতি রাজনৈতিক ক্যাডারে রূপান্তরিত হয়ে শক্তিশালী সাংগঠনিক ভিত্তি তৈরি করে ফেলেছে।তামিলনাড়ু বিজেপির সাবেক সভাপতি কে. আন্নামালাই সভাপতি পদ ছাড়ার পর নতুন রাজনৈতিক আন্দোলন বা দল গড়ার আভাস দিচ্ছেন। নির্বাচনী কৌশল এবং আসন ভাগাভাগি নিয়ে দলের ভেতরের অভ্যন্তরীণ মতভেদগুলো মুরগানের জন্য নতুন মাথাব্যথার কারণ। দলের নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ রেখে নতুন একটি বিকল্প ধারা তৈরি করা তাঁর জন্য সহজ হবে না।
তামিলনাড়ুতে বিজয়ের TVK এখন একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক বাস্তবতা। এই পরিস্থিতিতে এল. মুরগানের জন্য দিল্লির ক্ষমতা ছেড়ে তামিলনাড়ুর মাটিতে নেমে লড়াই করা একদিকে যেমন তাঁর রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের জন্য অগ্নিপরীক্ষা, ঠিক তেমনি তামিলনাড়ুর মাটিতে পদ্ম ফোটানোর জন্য বিজেপির শেষ মরিয়া চেষ্টা। আপনাদের কি মনে হয় তামিলনাড়ুতে বিজেপির মাটি শক্ত করতে মুরগানের মন্ত্রিন্তের ইস্তফা কতটা সঠিক?