ঘরে ফিরবেন কীভাবে? ট্রেনের টিকিট আছে, কিন্তু ট্রেনই নেই। রেলপথে ধস নামতেই উত্তরবঙ্গের সঙ্গে কার্যত বিচ্ছিন্ন দক্ষিণবঙ্গ। আর এই সুযোগেই কি শুরু হয়েছে যাত্রীদের পকেট কাটার খেলা? ট্রেন বাতিল, রাস্তায় উপচে পড়া ভিড়, আর বাসের টিকিটের দাম লাফিয়ে কয়েকগুণ। বিপর্যয়ের ধাক্কায় যখন মানুষ ঘরে ফেরার পথ খুঁজছেন, তখন সেই অসহায়তাই কি হয়ে উঠেছে কারও কারও ব্যবসার সুযোগ?

একদিকে বিপর্যয় কাটিয়ে একে একে স্বাভাবিক ছন্দে পৌঁছচ্ছে বুদ্ধের দেশ নেপাল। অন্যদিকে আরও এক বিপর্যয় বঙ্গে। যার ফলে কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে উত্তর ও দক্ষিণবঙ্গ। টানা বৃষ্টি। নিউ ফরাক্কা স্টেশন সংলগ্ন এলাকায় ধসের কারণে ট্রেন চলাচল ব্যাহত। বৃহস্পতিবার সকালে নিউ ফরাক্কা স্টেশন সংলগ্ন এলাকায় ধস নেমেছিল। তা সেদিনই সারিয়ে ফেলেছিলেন রেলের কর্মীরা। তবে তার পরেও ঘটে বিপত্তি। গভীর রাতে ফের একবার ওই এলাকাতেই ধস নামে। একই জায়গায় বার বার ধস। সেখানকার মাটি আলগা হয়ে আসায় বালির বস্তা এবং স্টোনচিপ্স চাপিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা। যার জেরে শনিবারও বাতিল একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ ট্রেন।
বাতিল ট্রেন
আলিপুরদুয়ার-শিয়ালদহ তিস্তাতোর্সা এক্সপ্রেস
মালদহ টাউন-হাওড়া ইন্টারসিটি এক্সপ্রেস
নাহারলাগুন-সাঁতরাগাছি স্পেশ্যাল ট্রেন
সহর্ষ-শিয়ালদহ হাটেবাজারে এক্সপ্রেস
গুয়াহাটি-হাওড়া সরাইঘাট এক্সপ্রেস
আলিপুরদুয়ার-শিয়ালদহ কাঞ্চনকন্যা এক্সপ্রেস
বামনহাট-শিয়ালদহ উত্তরবঙ্গ এক্সপ্রেস
হলদিবাড়ি-শিয়ালদহ দার্জিলিং মেল
বালুরঘাট-শিয়ালদহ এক্সপ্রেস
নিউ আলিপুরদুয়ার-শিয়ালদহ পদাতিক এক্সপ্রেস
জলপাইগুড়ি রোড-শিয়ালদহ হামসফর এক্সপ্রেস
রাধিকাপুর-কলকাতা এক্সপ্রেস
কাটিহার-হাওড়া এক্সপ্রেস,
রাধিকাপুর-হাওড়া কুলিক এক্সপ্রেস
বালুরঘাট-কলকাতা তেভাগা এক্সপ্রেস
আজ়িমগঞ্জ-সাহেবগঞ্জ মেমু
আজ়িমগঞ্জ-বরহারওয়া প্যাসেঞ্জার
আজ়িমগঞ্জ-ভাগলপুর প্যাসেঞ্জার ট্রেন
এছাড়াও একাধিক ট্রেনের গতিপথ ঘুরিয়ে দেওয়া হয়েছে। কিছু ট্রেন নিউ ফরাক্কা, আজ়িমগঞ্জ, কাটোয়া দিয়ে ঘোরানো হচ্ছে। প্রতিদিন শয়ে শয়ে মানুষ শুধু চিকিৎসার জন্য উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শহর কলকাতার সরকারি মেডিক্যাল কলেজগুলির বহির্বিভাগে আসেন। তাঁরা রাতের ট্রেনে উত্তর দিনাজপুর, দক্ষিণ দিনাজপুর, মালদহ, মুর্শিদাবাদ থেকে রেলপথে শিয়ালদহ, হাওড়া বা কলকাতা স্টেশনে নামেন। সেখান থেকে নিকটবর্তী মেডিক্যাল কলেজগুলিতে পৌঁছে যান ভোরে। চিকিৎসককে দেখিয়ে হাসপাতালের কাউন্টার থেকে ওষুধ নিয়ে দুপুরের বাস ধরে নিজ নিজ জায়গায় ফিরে যান। উত্তরবঙ্গ থেকে আসেন পড়ুয়ারা। আসেন ব্যবসায়ীরাও। বিপাকে পড়েছেন তাঁরা। এই পরিস্থিতিতে উত্তরবঙ্গের সঙ্গে দক্ষিণবঙ্গের যোগাযোগের জন্য যাত্রীদের এখন একমাত্র ভরসা সড়কপথ। ঠিক এই পরিস্থিতিতে সুযোগে সৎ ব্যবহার করছেন বাস মালিকরা। পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বেসরকারি বাসের ভাড়া।
১,৭০০ টাকার টিকিট ৬ হাজার টাকায় বিকোচ্ছে বলে অভিযোগ। টিকিটের এই কালোবাজারির জাঁতাকলে পড়েছেন যাত্রীরা। এমন পরিস্থিতিতে শুক্রবার রাজ্য সরকারের তরফে কলকাতা-শিলিগুড়ি রুটে অতিরিক্ত ২৩টি বাস নামানো হয়। শিলিগুড়ি থেকে কলকাতার উদ্দেশে ১৮ টি বাস চলছে। দুর্গাপুর-বালুরঘাট রুটে ২ অতিরিক্ত বাস বরাদ্দ করা হয়। মালদহ-কলকাতা রুটে বিশেষ পরিষেবায় ৫ টি বাস চালানো হচ্ছে। কিন্তু অতিরিক্ত বাসে টিকিট কাটতে গেলেও হয়রানির শিকার। সরকারি বাসের সিট সংখ্যা যেখানে ৫০, মানে বসে যেতে পারবেন ৫০ জন। তখন টিকিট কাউন্টারের সামনে লাইনে দাঁড়িয়ে ৩০০ জন। মানে বলতে গেলে ভূমিধসে উত্তরবঙ্গ থকে দক্ষিণবঙ্গ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় হয়রানির ছবি কমছে না।
ট্রেন বন্ধ, তাই বাসই এখন ভরসা। আর যাত্রীদের এই বাধ্যতাকেই কি সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে? যে টিকিটের দাম ছিল ১,৭০০ টাকা, সেটাই ছহাজার। ঘরে ফিরতে হবে, তাই বাড়তি টাকা দিয়েও টিকিট কাটতে বাধ্য হচ্ছেন মানুষ। একদিকে রেললাইন সারানোর কাজ চলছে, অন্যদিকে সেই সুযোগে যদি পরিবহণের কালোবাজারি চলে, তাহলে বিপদের সময়ে সাধারণ যাত্রী যাবেন কোথায়? রেলপথ কবে স্বাভাবিক হবে, তার অপেক্ষা তো রয়েছেই। কিন্তু তার আগে প্রশ্ন, ঘরে ফেরার এই অসহায়তাকে কি ব্যবসার সুযোগ বানানো হবে?