একের পর এক আস্তানা বদল। বারে বারে পুলিশের হাত থেকে বাঁচতে সবসময়ই ফাইভ স্টার ছেড়ে বেছে নিয়েছিলেন ওয়ান স্টার বা স্টার বিহীন পাতি হোটেল। কখনও বাস স্ট্যান্ডের পাশের হোটেল। আবার কখনও একটু দূরে। থাকা-খাওয়া সহ যাবতীয় খরচ মেটানো হয় নগদে। কোনওভাবে যাতে তাঁকে ট্র্যাক না করা যায় তার জন্য নতুন একটি মোবাইল ফোন কিনে সেখানে নতুন সিম ভরে ব্যবহার করছিলেন। কয়েকটি জায়গায় পরিচয়পত্র হিসেবে ভোটার কার্ড ব্যবহার করেছিলেন। ভোটার কার্ডে সাদা-কালো ছবি থাকে। যা দেখে খুব সহজে পরিচয় যাচাই সম্ভব হয় না। এত আঁটঘাট বেঁধেও ফাঁকি দেওয়া গেল না পুলিশের চোখকে।

সাজিয়েছিলেন মাস্টারপ্ল্যান। কিন্তু শেষ পর্যন্ত হার মানতে হয় পুলিশের কাছে। একেবারে একদম সাধারণ মানুষের মতো বাসে বাসে ঘুরে বেরিয়েছিলেন তিনি। একেবারে পেশাদার অপরাধীর মতো পশ্চিমবঙ্গ ছেড়ে ভিনরাজ্যগুলোতে পালিয়ে বেড়িয়েছেন বাগুইআটি এককালীন দাপুটে তৃণমূল নেতা দেবরাজ চক্রবর্তী।
কোন পথে তিনি কলকাতা ছেড়েছিলেন? কীভাবে গা ঢাকা দিয়েছিলেন? কলকাতা থেকে প্রথমে কোথায় গিয়েছিলেন। সেখান থেকে বাসে করে গা ঢাকা দিতে ঠিক কোন জায়গায় পৌছেছিলেন অ্যানিমেশনের মাধ্যমে দেখে নেওয়া যাক এক নজরে।
১৫ জুন কলকাতা থেকে বাসে রওনা দেন দেবরাজ। প্রথমেই চলে গিয়েছিলেন ওড়িশা। সেখানে কিছুদিন গা ঢাকা দেওয়ার পর আবার আস্তানা পরিবর্তন করেন। সেখান থেকে অন্ধ্রপ্রদেশে গিয়ে পৌঁছন। সেখান থেকে চলে যান তামিলনাড়ু। তবে ভাবলেন এবারও তাঁর আস্তানা পরিবর্তনের দরকার। তাই সেখান থেকে আবার আস্তানা বদল করে পৌঁছে যান কেরল। সেখান থেকে জামশেদপুর হয়ে ঝাড়খণ্ডের ধানবাদে পৌঁছন দেবরাজ।
একেবারে পেশাদার অপরাধীর মতো পশ্চিমবঙ্গ ছেড়ে ভিনরাজ্যগুলোতে পালিয়ে বেড়িয়েছিলেন তিনি। ওড়িশা থেকে বিভিন্ন রাজ্য হয়ে ঝাড়খণ্ডে পৌঁছনো ও থাকা-খাওয়া সহ যাবতীয় খরচ নগদে মেটান দেবরাজ চক্রবর্তী। কোনওভাবে যাতে তাঁকে ট্র্যাক না করা যায় তার জন্য নতুন একটি মোবাইল ফোন কেনেন। সেখানে নতুন সিম ভরে ব্যবহার করেছিলেন তিনি। ১৫ দিন তিনি যে সকল হোটেলে থেকেছেন, সবকটিই বেশ ছোট। বাস স্ট্যান্ড লাগোয়া ছোট ছোট হোটেল তিনি রাত কাটানোর জন্য বেছে নিয়েছিলেন। কারণ, সেখানে পরিচয় যাচাই নিয়ে বেশি কড়াকড়ি থাকে না। কয়েকটি জায়গায় দেবরাজ পরিচয়পত্র হিসেবে ভোটার কার্ড ব্যবহার করেছিলেন। কারণ, ভোটার কার্ডে সাদা-কালো ছবি থাকে। যা দেখে খুব সহজে পরিচয় যাচাই সম্ভব হয় না। পুলিশ সূত্র মারফত জানা যায়, যে হোটেলে সম্ভব হয়েছিল, সেখানে দেবরাজ পরিচয়পত্র দেওয়ার জায়গায় টাকা দিয়ে বিষয়টি মিটিয়ে দেন। আর যেখানে যেখানে পরিচয়পত্র জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক ছিল, সেখানে তিনি ভোটার কার্ড দেন। কিন্তু শেষ রক্ষা হল না। পুলিশের চোখকে ফাঁকি দিলে ১৫ দিন ঘুরে বেড়ালেও, ১৬ দিনের মাথায় ঝাড়খণ্ডের মুরির একটি রিসর্ট থেকে দেবরাজ চক্রবর্তীকে পাকড়াও করেছে রাজ্য পুলিশের এসটিএফ।
টাওয়ার লোকেশন এড়াতে নিজের মোবাইল ফোন বন্ধ রেখেছিলেন দেবরাজ চক্রবর্তী। যদিও তাঁকে ধরিয়ে দেয় বন্ধুর মোবাইল ফোনের টাওয়ার লোকেশন। শেষ আস্তানাটা ছিল এই বন্দুর হোটেল। বন্ধুর মোবাইল ট্যাক করেই মেলে বাগুইআটির দাপুটে তৃণমূল নেতার হদিশ। বুধবার সন্ধেয় নাটকীয়ভাবে সেই রিসর্টের পৌঁছে দরজার নক করেন এসটিএফ-এর অফিসাররা। দরজা খুলতেই গ্রেফতার করা হয় দেবরাজ চক্রবর্তীকে।
ট্রানজিট রিমান্ডে রাজ্যে ফিরিয়ে আনার পর, বিধাননগরের প্রাক্তন তৃণমূল কাউন্সিলর এবং প্রাক্তন মেয়র পারিষদকে তোলা হয় বারাসাত আদালতে। সেখানে দেবরাজ চক্রবর্তীকে আনতেই ক্ষোভে ফেটে পড়েন আইনজীবীদের একাংশ। আদালত চত্বরেই প্রাক্তন তৃণমূল বিধায়ক অদিতি মুন্সির স্বামীকে লক্ষ্য করে ছোড়া হয় ডিম। ধৃত দেবরাজ চক্রবর্তীর বিরুদ্ধে তোলাবাজি, প্রতারণা, আর্থিকভাবে বিশ্বাসভঙ্গ, অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র, প্রাতিষ্ঠানিক অপরাধের মতো একাধিক জামিন অযোগ্য ধারায় রুজু হয় মামলা। বৃহস্পতিবার তাঁকে ৭ দিনের পুলিশ হেফাজতে পাঠায় বারাসাত আদালত।
বিধাননগর পুরসভার প্রাক্তন মেয়র পারিষদ দেবরাজ চক্রবর্তী গ্রেপ্তারির পর থেকে সামনে আসছে নানা তথ্য। দেবরাজের সঙ্গে আরও অনেকেই যে অপরাধচক্রে যুক্ত। সিটের দাবি, কমপক্ষে ৩০ জন এই দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত। দক্ষিণ দমদম, রাজারহাট, নিউটাউনের একাধিক তৃণমূল নেতা যুক্ত ছিলেন। তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদ করে নানা তথ্য পাওয়া যাবে বলেই মনে করছেন তদন্তকারীরা। তাঁদের দিকে বিশেষ নজর তদন্তকারীদের। ইতিমধ্যে দেবরাজ ঘনিষ্ঠ চারজনকে তলব করা হয়েছে। আরও বেশ কয়েকজনকে তলবের সম্ভাবনা।