সুস্মিত মজুমদার,নিজস্ব সংবাদদাতা: চুঁচুড়ার বড় শীল বাড়ির দুর্গাপুজোর গল্পটা অন্যান্য বনেদি বাড়ির দুর্গাপুজোর গল্পের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। ডাচ শহর চুঁচুড়া এমনিতেই তার অলিগলি আর সরু সরু পথের জন্য পরিচিত। তেমনই একটি ছোট্ট গলি দিয়ে ঢোকার পর হঠাৎই যেন চোখের সামনে খুলে যায় অন্য এক জগৎ। আর সেখানেই দাঁড়িয়ে রয়েছে চুঁচুড়ার এই শতাব্দী প্রাচীন বড় শীল বাড়ি। এই সরু গলির ভিতরে যে এত বিশাল একটি বনেদি বাড়ি থাকতে পারে, তা নিজের চোখে না দেখলে সত্যিই বিশ্বাস করা কঠিন।

শতাব্দীপ্রাচীন এই বাড়ির মূল দরজা দিয়ে প্রবেশ করার পর কিছুটা এগিয়ে ডানদিকে ঘুরলেই চোখে পড়ে বাড়ির বিশাল ঠাকুরদালান। নিজস্ব স্থাপত্যশৈলী আর আভিজাত্যে যা সত্যিই অসাধারণ। আর এই ঠাকুরদালানেই প্রতি বছর অনুষ্ঠিত হয় দুর্গাপুজো। তবে এই বাড়ির দুর্গাপুজোর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে একটি বেশ অন্যরকম গল্প। এখানে মায়ের পুজো হয় ছেলের দালানে। কারণ, বাড়ির যে বিশাল ঠাকুরদালানটি আজ দুর্গাপুজোর জন্য ব্যবহৃত হয়, সেটি আসলে কার্তিকের দালান। এই দালানে গত ২০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে ধুমধাম করে হয়ে আসছে কার্তিক পুজো।
আর সেই কার্তিকের দালানেই প্রায় ৩০ বছর আগে থেকে শুরু হয় দুর্গাপুজো। যদিও একটি তথ্য অনুযায়ী, একসময় এই শীল বাড়িতেই দুর্গাপুজো হতো। কোনও এক কারণে সেই পুজো বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তীতে প্রায় ৩০ বছর আগে আবার নতুন করে শুরু হয় এই দুর্গাপুজো। বিশাল এই ঠাকুরদালানের সামনে দাঁড়ালে তার স্থাপত্যের জৌলুস সত্যিই চোখ ধাঁধিয়ে দেয়। পরপর তিনটি ধাপে তৈরি এই ঠাকুরদালান। একেবারে সামনেই রয়েছে বিশাল বিশাল কয়েকটি গোলাকার পিলার, যা দালানের সৌন্দর্য আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
সিঁড়ি দিয়ে ঠাকুরদালানে ওঠার পর এই পিলারগুলি পেরিয়ে চোখে পড়ে পরপর বেশ কয়েকটি আর্চিং। আর সেই আর্চিংগুলিও অসাধারণ কারুকার্যে পূর্ণ। এক ধাপ আর্চিং পেরিয়ে রয়েছে আরও একটি ধাপ। আর তার পরেই রয়েছে ঠাকুরের বেদি। এই বেদিতেই কার্তিক মাসে কার্তিক পুজো আর শরৎকালে অনুষ্ঠিত হয় দুর্গোৎসব। এই বাড়ির দুর্গাপুজোর আর একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হল, এখানকার দেবী দুর্গার রূপ। এখানে দেবী দুর্গা অভয়া মূর্তিতে পূজিতা হন। কোনও সংহারমূর্তি নয়। দেবীর পাশে রয়েছেন শিবঠাকুরও। আর এই পুজোয় কোনও বলি দেওয়ার প্রথা নেই। পরিবারের সদস্যসংখ্যা অনেক হলেও এই বাড়ির দুর্গাপুজোয় কোনও পালা করে পুজো করার রীতি নেই। কারণ, পরিবারের সদস্যদের মতে, পালা করে পুজো করলে প্রতিবছর পুজোর জৌলুস একরকম থাকবে না। তাই পরিবারের সকল সদস্য মিলে একসঙ্গে এই পুজোর আয়োজন করেন।
পুজোর কটা দিন তাই বড় শীল বাড়িতে তৈরি হয় এক অন্যরকম পরিবেশ। পরিবারের সদস্যরা বছরের বিভিন্ন সময়ে ছড়িয়ে থাকেন বিভিন্ন জায়গায়। কিন্তু দুর্গাপুজো এলেই সবাই ফিরে আসেন এই বাড়িতে। নিষ্ঠা, আচার আর ধুমধামের সঙ্গে অনুষ্ঠিত হয় দেবীর আরাধনা। আর পুজোর কটা দিন পরিবারের সকলে একসঙ্গে খাওয়া-দাওয়া, আনন্দ আর আড্ডায় মেতে ওঠেন। একদিকে ২০০ বছরেরও বেশি সময়ের কার্তিক পুজোর ঐতিহ্য, অন্যদিকে প্রায় তিন দশক ধরে চলে আসা দুর্গাপুজো এই দুইয়ের মেলবন্ধনেই চুঁচুড়ার বড় শীল বাড়ির পুজো হয়ে উঠেছে একেবারেই আলাদা। সরু গলির আড়ালে লুকিয়ে থাকা এই বিশাল বনেদি বাড়ি তাই শুধু একটি স্থাপত্য নয়, এর প্রতিটি দেওয়াল, প্রতিটি খিলান আর এই ঠাকুরদালান বয়ে নিয়ে চলেছে এক দীর্ঘ পারিবারিক ইতিহাস।