চোরবাগান সর্বজনীনে পদপিষ্ট হয়ে মৃত্যুর ঘটনার তদন্তে আরও এক ব্যক্তিকে আটক করল কলকাতা পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ। ধৃত সঞ্জীব রাহা ওরফে সেন্টু পুজো কমিটির কোষাধ্যক্ষের দায়িত্বে ছিলেন। পাশাপাশি, মণ্ডপে ঘোষকের ভূমিকাতেও দেখা গিয়েছিল তাঁকে।পুলিশ সূত্রে খবর, গোপন তথ্যের ভিত্তিতে এবং মোবাইল ফোনের টাওয়ার লোকেশন খতিয়ে দেখে নদিয়া থেকে সঞ্জীবের সন্ধান পান তদন্তকারীরা। এরপর তাঁকে আটক করে কলকাতায় নিয়ে আসা হয়। লালবাজারে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করে ঘটনার সঙ্গে তাঁর যোগসূত্র খতিয়ে দেখবেন গোয়েন্দারা। এর আগে এই ঘটনায় গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তিদের জেরা করেই সঞ্জীবের নাম সামনে আসে বলে জানা গিয়েছে।

উল্লেখ্য, গত ১৭ অক্টোবর মহাসপ্তমীর দিন বৃষ্টির মধ্যেই চোরবাগান পুজোমণ্ডপে ঘটে যায় মর্মান্তিক পদপিষ্টের ঘটনা। প্রবল ভিড়ের মধ্যে হুড়োহুড়ির জেরে প্রাণ হারান ১৯ জন। আহত হন আরও ২৫ জন। ঘটনার প্রাথমিক তদন্তে পুলিশের অনুমান, বিপুল সংখ্যক দর্শনার্থীর ভিড় সামাল দেওয়ার জন্য পুজো উদ্যোক্তাদের তরফে যথাযথ পরিকল্পনার অভাব ছিল। তদন্তে উঠে এসেছে, দুর্ঘটনার সময় মণ্ডপ চত্বরে উপচে পড়া ভিড়ের পাশাপাশি চলছিল বৃষ্টি। এমন পরিস্থিতিতে পুজো কমিটির মাইক থেকে বারবার ‘মণ্ডপ ভেঙে পড়ছে’ বলে ঘোষণা করা হয়েছিল বলে অভিযোগ। এই ঘোষণাকে কেন্দ্র করে দর্শনার্থীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। মণ্ডপ থেকে দ্রুত বেরিয়ে যাওয়ার তাগিদে শুরু হয় তীব্র ধাক্কাধাক্কি ও হুড়োহুড়ি। এর জেরেই পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে বলে অভিযোগ তদন্তকারীদের। ওই ঘোষণার ভূমিকা এবং দুর্ঘটনার নেপথ্যে দায়ীদের চিহ্নিত করতে তদন্ত চালাচ্ছে পুলিশ।
চোরবাগানের মর্মান্তিক পদপিষ্টের ঘটনার নেপথ্যে ঠিক কী কারণ ছিল, কোথায় গাফিলতি, আর কারা এর জন্য দায়ী—এই প্রশ্নগুলির উত্তর খুঁজতেই শুরু হয়েছে তদন্ত। ঘটনার প্রকৃত সত্য সামনে আনতে রাজ্য সরকার একটি বিশেষ তদন্তকারী দল (SIT) গঠন করেছে। অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি অনিন্দিতা রায় সরস্বতীর নেতৃত্বে চলছে এই তদন্ত। বৃহস্পতিবার ঘটনাস্থলে যান কলকাতা পুলিশের আধিকারিকরা। পাশাপাশি, ঘটনার বিভিন্ন দিক খতিয়ে দেখতে থ্রিডি স্ক্যানার নিয়ে পৌঁছয় ফরেন্সিক বিশেষজ্ঞদের দল। সিটের প্রধান স্পষ্ট জানিয়েছেন, তদন্তের আওতা থেকে কাউকেই বাদ রাখা হবে না। তাঁর কথায়, পুলিশের কোনও আধিকারিক কিংবা অন্য কোনও ব্যক্তি যাঁর গাফিলতিতেই এই বিপর্যয় ঘটে থাকুক না কেন, তাঁকে চিহ্নিত করাই তদন্তকারীদের প্রধান লক্ষ্য।
তবে রাজ্য সরকারের গঠিত তদন্ত কমিটির কার্যকারিতা নিয়ে অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে জনমনে সংশয় তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। অনেক ক্ষেত্রে তদন্ত দীর্ঘায়িত হওয়ার অভিযোগও উঠেছে। এই প্রসঙ্গে সিটের প্রধান জানান, তদন্ত নিয়ে এমন নেতিবাচক ধারণার সঙ্গে তিনি একমত নন। রাজ্য সরকার গোটা প্রক্রিয়া শেষ করার জন্য তিন মাসের সময়সীমা নির্ধারণ করেছে। তাঁর বিশ্বাস, সরকার নিছক লোকদেখানোর জন্য এই উদ্যোগ নেয়নি এবং মুখ্যমন্ত্রী বিষয়টি নিয়ে যথেষ্ট আন্তরিক। তিনি আরও জানান, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের কারণে কর্মরত বিচারপতির পরিবর্তে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। দ্রুততার সঙ্গে গোটা প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তদন্ত শেষ করে ঘটনার প্রকৃত কারণ ও দায়ীদের সম্পর্কে স্পষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর বিষয়ে আশাবাদী সিটের প্রধান।