বিশ্বজিৎ নস্কর, নিজস্ব সংবাদদাতা: দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা জেলার নামখানা ব্লকের ফ্রেজারগঞ্জ উপকূল থানার ঢিল ছোঁড়া দূরত্বে অবস্থিত শতাব্দী প্রাচীন এন্ডোফ্রেজারের বাংলো বাড়ি। বর্তমান সময়ে প্রায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। এটি দেখলেই পর্যটক থেকে এলাকাবাসীদের মনে একটাই প্রশ্ন আসে, সংস্কার কি করা যেত না ? সমুদ্রের গ্রাস থেকে কি উদ্ধার করা সম্ভব নয় ? তবে এ প্রশ্নের উত্তর না মিললেও কয়েকমাসের মধ্যেই এখানে এন্ডোফ্রেজারের মূর্তি স্থাপণের আশ্বাস মিলেছে। উল্লেখ্য এক সময় এই ফ্রেজারগঞ্জ অত্যাচারী ইংরেজদের পদধ্বনিতে কম্পিত হয়েছিল। পদ দলিত হয়েছিল এদেশের মান সম্মান সংস্কৃতি। তৎকালীন সময়ে এই নামখানা ব্লকের ফ্রেজারগঞ্জ এলাকায় আবির্ভাব হয়েছিলেন এন্ডোফ্রেজার।

ফ্রেজারগঞ্জ হল পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার অন্তর্ভুক্ত কাকদ্বীপ মহাকুমার নামখানা ব্লকের মধ্যে অবস্থিত একটি গ্রাম। বর্তমানে বকখালির সমুদ্র সৈকত লাগোয়া এই গ্রামটি। দেশ তখনও স্বাধীন হয়নি। এ দেশে রাজত্ব চালাচ্ছে ব্রিটিশরা। সেইসময় ফ্রেজার সাহেব এই বকখালিতে এসেছিলেন। বানিয়েছিলেন থাকার জন্য একটি বাংলো। পরবর্তীতে দেশ স্বাধীন হলেও সেই বাংলো সংস্কারের কোনও দায়িত্ব নেয়নি প্রশাসন। এলাকাবাসীরদের দাবি, বর্তমানে বাংলোর আর অস্তিত্ব নেই সেইভাবে। জরাজীর্ণ অবস্থা তার। ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ছে বাংলো। ঘরের মধ্যে গজিয়ে উঠেছে বড় বড় বট, অশত্থ গাছ। প্রচুর মানুষ এই বাংলো দেখতে আসেন। বকখালিতে এটাও একটা টুরিস্ট স্পটে পরিণত হয়েছে। অত্যাচারী ইংরেজ শাসক সাহেব এন্ডেফ্রেজারের নাম অনুসারে নামাঙ্কিত এই জায়গাটি এখনও ইতিহাসের শেষ সাক্ষী হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। ফ্রেজার সাহেবের অতিথি শালার একটি ধ্বংসাবশেষ।

সালটা ১৯০৩, উড়িষ্যা থেকে বাংলার ছোট লাট লেফটেন্যান্ট গভর্মেন্ট হয়ে গেলেন অ্যান্ড্রিউ ফ্রেজার। তবে শাসন করার আগেই তিনি এ সমস্ত এলাকা ঘুরে দেখতে গিয়ে বঙ্গোপসাগরের উপকূলে এই ছোট্ট গ্রামটি আবিষ্কার করেন। যার নাম নারায়ণতলা। এই গ্রামের প্রেমে পড়ে গেলেন ফ্রেজার সাহেব। সেখানেই তৈরি করে ফেললেন বিলাসবহুল বাংলো। বাংলোর চারিদিকে হাজার হাজার নারকেল গাছ বসিয়ে নারকেল বাগান তৈরি করে ফেলেন। পরবর্তীকালে ফ্রেজার সাহেবের নাম অনুসরণ করে নারায়ণতলা হয়ে ওঠে ফ্রেজারগঞ্জ। জনশ্রুতি আছে কলকাতায় যাওয়ার সময় ফ্রেজার সাহাবের জাহাজ এই জায়গায় দুর্ঘটনার কবলে পড়ে। তাঁকে অর্ধমৃত অবস্থায় উদ্ধার করে এক গ্রাম্য কিশোরী। সুস্থ হবার পর ফ্রেজার সাহেব এই জায়গায় থাকতে শুরু করেন। তারপরও শাসকদলের লোকজন ওই ফ্রেজার সাহেবকে নিয়ে কলকাতায় ফেরেন। তবে যে কিশোরী ফ্রেজারসাহেবকে সেবাকরে শুশ্রূষা করে বাঁচিয়েছিলেন তার আর খোঁজ মেলেনি। কেউ কেউ বলেন তাকে খুন করা হয়েছে। কেউ আবার বলেন বেপাত্তা। তবে সঠিক কারণ জানা যায়নি।
বঙ্গোপসাগরের উপকূলে দিনের পর দিন ভূমিক্ষয় শুরু হয়। ১৯০৮ সালে গভর্নর বদল হবার পর আর কোন ব্রিটিশ অঞ্চলটি সংরক্ষণের আগ্রহ দেখায়নি। ১৯১১ সালে ভারতের রাজধানী কলকাতা থেকে দিল্লিতে স্থানান্তরিত হলে অন্ধকারে তলিয়ে যায় এই সমস্ত এলাকা। তারপর সময় যত এগিয়েছে উত্তাল সমুদ্র আস্তে আস্তে গ্রাস করেছে এই বাংলোকে, আর শেষ সাক্ষী হিসেবে দাঁড়িয়ে থাকা ফ্রেজার সাহেবের বাংলোকে অসহায় ভাবে আত্মসমর্পণ করতে হয়েছে সমুদ্রের কাছে। বিশাল বাংলো নারকেল বাগান তলিয়ে যাবার পর কেবলমাত্র অতিথি শালার ভগ্নাবশেষ টুকরো টুকরো ইট এখনও আছে ইতিহাসের শেষ সাক্ষী হিসাবে। হয়তো আর কিছুদিনের মধ্যে সে সার্টিফিকেট ও সমুদ্রে তলিয়ে যাবে।

তবে স্বাধীনতার পর যে সমস্ত সরকার এসেছে এই বাংলো বাঁচাবার কোন চেষ্টা করেছিল কিনা তা জানা যায়নি। তবে বর্তমান সরকারের সুন্দরবন বিষয়ক উন্নয়ন মন্ত্রীর চেষ্টায় আর কিছুদিনের মধ্যে তৈরি হবে স্যার অ্যান্ড্রিউ ফ্রেজারের মূর্তি। যা জানান দেবে বিগত দিনে ছিল আজও দাঁড়িয়ে রয়েছে ইতিহাসের শেষ সাক্ষী হিসেবে। এ বিষয়ে এক পর্যটক জাকির হোসেন জানান, “ইংরেজ আমলে এই ঐতিহাসিক বাংলা বাড়িটি সংরক্ষণ করা দরকার ছিল রাজ্য সরকারের। রাজ্য সরকার এই বাংলো বাড়িটি সংরক্ষণ করলে বকখালি ঘুরতে আসা পর্যটকদের অন্যতম ডেস্টিনেশন হতো এই ফ্রেজার সাহেবের বাংলা বাড়ি। রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে প্রায় ভগ্নপ্রায় দশা হয়ে দাঁড়িয়েছে।”
“ইংরেজ আমলে এই ঐতিহাসিক বাংলো বাড়িটি সংরক্ষণ করার দরকার ছিল রাজ্য সরকারের। রাজ্য সরকার এই বাংলো বাড়িটি সংরক্ষণ করলে বকখালি ঘুরতে আসা পর্যটকদের অন্যতম ডেস্টিনেশন হতো এই ফ্রেজার সাহেবের বাংলা বাড়ি। রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে প্রায় ভগ্নপ্রায় দশা হয়ে দাঁড়িয়েছে।” এ বিষয়ে নামখানা পঞ্চায়েত সমিতির খাদ্যের কর্মাধ্যক্ষ নীলকণ্ঠ বর্মণ বলেন, “দীর্ঘদিন ধরে রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ভগ্নপ্রায় দশা হয়ে গিয়েছে ফ্রেজার সাহেবের ঐতিহাসিক বাংলো বাড়ির। ইতিমধ্যেই গঙ্গাসাগর বকখালি ব্লক ডেভেলপমেন্ট অথরিটির পক্ষ থেকে ওই বাংলো বাড়িটি সংরক্ষণের কাজ শুরু করা হয়েছে। ইতিমধ্যে নির্মাণ করা হয়েছে কংক্রিটের রাস্তা ও নদী বাঁধ। ওই বাংলা বাড়িটি নতুন করে সংস্কারের কাজ শুরু করা হয়েছে। শুধু বাংলো বাড়ি নয়, ওই জায়গায় ফ্রেজার সাহেবের একটি মূর্তি ও নির্মাণ করা হবে। আগামীদিনে পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে যাবে ফ্রেজারগঞ্জের ঐতিহাসিক ফ্রেজার সাহেবের এই বাংলো বাড়ি।”

এ বিষয়ে নামখানা পঞ্চায়েত সমিতির খাদ্যের কর্মাধ্যক্ষ নীলকণ্ঠ বর্মন বলেন, “দীর্ঘদিন ধরে রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ভগ্নপ্রায় দশা হয়ে গিয়েছে ফ্রেজার সাহেবের ঐতিহাসিক বাংলো বাড়ি। ইতিমধ্যেই গঙ্গাসাগর বকখালি ব্লক ডেভেলপমেন্ট অথরিটির পক্ষ থেকে ওই বাংলো বাড়িটি সংরক্ষণের কাজ শুরু করা হয়েছে। নির্মাণ করা হয়েছে কংক্রিটের রাস্তা ও নদী বাঁধ। ওই বাংলা বাড়িটি নতুন করে সংস্কারের কাজ শুরু করা হয়েছে। শুধু বাংলো বাড়ি নয়, ওই জায়গায় ফ্রেজার সাহেবের একটি মূর্তি ও নির্মাণ করা হবে। আগামীদিনে পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে যাবে ফ্রেজারগঞ্জের ঐতিহাসিক ফ্রেজার সাহেবের এই বাংলা বাড়ি। “
অনুপ মণ্ডল নামে স্থানীয় এক বাসিন্দা তিনি জানান, “দিনের পর দিন রক্ষণাবেক্ষণের অভাব এবং নদী ভাঙনের জেরে ভগ্নপ্রায় দশা অ্যান্ড্রিউ ফ্রেজার সাহেবের ঐতিহাসিক এই বাংলো বাড়িটির। একটু একটু করে নদী ভাঙনে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গিয়েছে বিশাল বাড়ি। রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে যদি এই বাংলো বাড়িটি সংরক্ষণ করা যায়, তাহলে পর্যটকদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়াবে বাড়িটি।” এবিষয়ে দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলা পরিষদের সহ-সভাপতি সীমান্ত মালি বলেন, “অ্যান্ড্রিউ ফ্রেজার সাহেবের বাংলো অনেকদিন আগে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গিয়েছে। এটি সেই বাংলো বাড়ির একটি অংশ। অনেক দেরি হয়ে গিয়েছে নদী ভাঙনের জেরে ক্রমশ ভগ্নপ্রায় দশা হয়ে দাঁড়িয়েছে এই বাংলা বাড়িটির। রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে সংরক্ষণ করার চেষ্টা চালানো হচ্ছে। কিন্তু তাতে লাভ হবে না বলে আমার মনে হয়! এই বাড়িটিও নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাবে এলাকাবাসীদের কথা মাথায় রেখে নদীবাঁধ নির্মাণের কাজ শুরু করা হয়েছে। বাংলো বাড়িটি রক্ষা না করতে পারলেও, এলাকার মানুষদের রক্ষা করার জন্য আমরা নদী বাঁধ নির্মাণ করার কাজ শুরু করেছি। “
কালের নিয়মে ধীরে ধীরে একটু একটু করে ইতিহাসের পাতা থেকে মুছে যাচ্ছে ফ্রেজারগঞ্জের ঐতিহাসিক অ্যান্ড্রিউ ফ্রেজার সাহেবের ঐতিহাসিক বাংলো বাড়ি।