বিশ্বজিৎ নস্কর, নিজস্ব সংবাদদাতা : দক্ষিণ ২৪ পরগনার বারুইপুরে নাবালিকা ধর্ষণ ও খুনের ঘটনায় তদন্তে বড় সাফল্য পেল তদন্তকারী সংস্থা। এই বহুল আলোচিত মামলায় প্রধান অভিযুক্ত আনন্দ সর্দারকে গ্রেফতার করেছে স্পেশাল টাস্ক ফোর্স (এসটিএফ)। বারুইপুর বাজার সংলগ্ন এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। তদন্তকারীদের দাবি, আনন্দ সর্দারই এই নৃশংস ঘটনার মূল অভিযুক্ত। এই গ্রেফতারের পর মামলায় মোট গ্রেফতারের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াল তিন। ধৃতকে জিজ্ঞাসাবাদ করে ঘটনার নেপথ্যের সমস্ত তথ্য জানার চেষ্টা করছেন তদন্তকারীরা। পাশাপাশি, এই অপরাধে আরও কেউ জড়িত রয়েছে কি না, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

ঘটনার পর থেকেই বারুইপুরে উত্তেজনা অব্যাহত রয়েছে। পুলিশ গোটা এলাকায় কড়া নজরদারি চালাচ্ছে। তদন্তের স্বার্থে বিভিন্ন দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং ফরেনসিক রিপোর্ট-সহ অন্যান্য প্রমাণ সংগ্রহের কাজও চলছে।
এদিকে, নিহত নাবালিকার পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে ঘটনাস্থলে পৌঁছন তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতিনিধি দল। প্রতিনিধি দলে ছিলেন সাংসদ দোলা সেন, প্রতিমা মণ্ডল এবং বিধায়ক বিমান বন্দ্যোপাধ্যায় ও বিভাস সর্দার। তাঁরা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ কথা বলেন এবং তাঁদের বক্তব্য শোনেন।
পরিবারের সদস্যরা দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও দ্রুত বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার দাবি জানান। প্রতিনিধি দলের পক্ষ থেকে আশ্বাস দেওয়া হয় যে, আইনের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে যা যা প্রয়োজন, তা করা হবে এবং প্রশাসন পরিবারের পাশে রয়েছে। পরে সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে প্রতিনিধিরা জানান, এই ঘটনায় কোনও অপরাধীকে রেয়াত করা হবে না এবং তদন্ত দ্রুত শেষ করে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
এরই মধ্যে তদন্ত চলাকালীন আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা সামনে আসে। নাবালিকার দেহ উদ্ধারের পর যে পুকুরে পুলিশ সার্চ অপারেশন চালাচ্ছিল, সেই পুকুর থেকেই উদ্ধার হয় আরও এক ব্যক্তির মৃতদেহ। মৃতের পরিচয় হয়েছে কৃষ্ণকান্ত হালদার। জানা গিয়েছে, তিনি গত শুক্রবার থেকে নিখোঁজ ছিলেন।
পুলিশ মৃতদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠিয়েছে। ইতিমধ্যেই পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে বারুইপুর থানার পুলিশ। কৃষ্ণকান্ত হালদারের মৃত্যুর কারণ নিয়ে তদন্ত শুরু হয়েছে। তাঁর কোনও ব্যক্তিগত শত্রু ছিল কি না, তিনি কী কাজ করতেন এবং এটি খুন নাকি স্বাভাবিক মৃত্যু—সব দিকই খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট হাতে পাওয়ার পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা মিলবে বলে মনে করছে তদন্তকারীরা।
অন্যদিকে, এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক চাপানউতোরও তীব্র হয়েছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল দোষীদের কঠোর শাস্তির দাবিতে সরব হয়েছে। এদিন বামপন্থী সংগঠন এসইউসিআই (SUCI)-এর পক্ষ থেকেও বারুইপুর থানায় ডেপুটেশন জমা দেওয়া হয়। থানা ঘেরাও কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের ধস্তাধস্তির ঘটনাও ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশকে অতিরিক্ত বাহিনী মোতায়েন করতে হয়। যদিও পরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়।
বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসন ব্যর্থ হয়েছে। তাঁরা দ্রুত তদন্ত শেষ করে অভিযুক্তদের কঠোর শাস্তির দাবি জানান। পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আইনশৃঙ্খলা বজায় রেখেই সকলের গণতান্ত্রিক কর্মসূচি পালনের সুযোগ দেওয়া হয়েছে এবং কোথাও আইন ভাঙার চেষ্টা হলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বারুইপুরের এই নৃশংস ঘটনাকে ঘিরে রাজ্যজুড়ে ক্ষোভ ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তদন্ত যত এগোচ্ছে, ততই উঠে আসছে নতুন নতুন তথ্য। প্রধান অভিযুক্তের জিজ্ঞাসাবাদ থেকে আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মিলতে পারে বলে আশা তদন্তকারীদের। একইসঙ্গে কৃষ্ণকান্ত হালদারের মৃত্যুর সঙ্গে এই ঘটনার কোনও যোগসূত্র রয়েছে কি না, সেই বিষয়টিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এখন নজর তদন্তের পরবর্তী ধাপের দিকে। নাবালিকা ধর্ষণ ও খুনের মামলায় দ্রুত চার্জশিট দাখিল এবং আদালতে দ্রুত বিচার প্রক্রিয়া শুরু হবে কি না, সেদিকেই তাকিয়ে রয়েছে নিহতের পরিবার, স্থানীয় বাসিন্দা এবং গোটা রাজ্য।