দেশের প্রথম দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি হাই-স্পিড ট্রেন বা বুলেট ট্রেন ‘B28’ তার নির্মাণ প্রক্রিয়ায় একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক পার করেছে। বেঙ্গালুরুতে সরকারি খাতের সংস্থা BEML-এর কারখানায় এই ট্রেনটির সফলভাবে ‘স্কুইজ টেস্ট’ (Squeeze Test) সম্পন্ন হয়েছে।

স্কুইজ টেস্ট (Squeeze Test) কী এবং কেন এটি জরুরি?
স্কুইজ টেস্ট হলো ট্রেনের বডি-শেল বা কাঠামোগত শক্তি পরীক্ষা করার একটি অত্যন্ত কঠোর পদ্ধতি।
পরীক্ষার প্রক্রিয়া: এতে ট্রেনের বডির ওপর নির্দিষ্ট পরিমাণে অতিরিক্ত চাপ বা বল প্রয়োগ করে দেখা হয় যে এর কাঠামো কতটা মজবুত।
নিরাপত্তা: ট্রেনটি যখন অত্যন্ত উচ্চ গতিতে ছুটবে, তখন কোনো অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতিতে বা টক্করের সময় এর ভেতরের যাত্রীদের বসার জায়গা যেন সম্পূর্ণ সুরক্ষিত থাকে এবং ট্রেনের কাঠামো যেন দুমড়ে-মুচড়ে না যায়, তা নিশ্চিত করতেই এই পরীক্ষা সফলভাবে উত্তীর্ণ হওয়া বাধ্যতামূলক।
B28 বুলেট ট্রেনের প্রধান গতি ও প্রযুক্তিগত বৈশিষ্ট্য:
গতিবেগ: এই ট্রেনটি সর্বোচ্চ ২৮০ কিমি/ঘণ্টা গতিতে পরীক্ষামূলকভাবে চালানোর (Maximum Test Speed) জন্য ডিজাইন করা হয়েছে। তবে এর অপারেশনাল বা নিয়মিত চলাচলের গতি হবে ২৪৯ কিমি/ঘণ্টা।
কোচ বিন্যাস: প্রতিটি B28 ট্রেন সেটে মোট ৮টি কোচ থাকবে (যার মধ্যে ৪টি মোটর কার এবং ৪টি ট্রেলার কার অন্তর্ভুক্ত)। ট্রেনটির মোট দৈর্ঘ্য হবে প্রায় ২০২ মিটার।
যাত্রী ধারণক্ষমতা: ট্রেনটিতে একসঙ্গে প্রায় ৫৫৭ জন যাত্রী ভ্রমণ করতে পারবেন। এর মধ্যে ৭টি স্ট্যান্ডার্ড ক্লাস এবং ১টি এক্সিকিউটিভ ক্লাস কোচ রয়েছে। প্রয়োজন সাপেক্ষে দুটি ৮-কোচের ট্রেনকে একসঙ্গে যুক্ত করে ১৬ কোচের কনফিগারেশনেও চালানো সম্ভব।
আধুনিক সুযোগ-সুবিধা ও ডিজাইন:
মেক ইন इंडिया উদ্যোগ: ভারতের নিজস্ব প্রযুক্তিতে এই ট্রেন তৈরির ফলে হাই-স্পিড রেল খাতে দেশের বৈদেশিক নির্ভরতা যেমন কমবে, তেমনই ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ প্রকল্প এক বিশাল শক্তি অর্জন করবে।
আরামদায়ক আসন ও ইন্টেরিয়র: ভারতীয়দের শারীরিক গঠন ও স্বাচ্ছন্দ্যের কথা মাথায় রেখে এর সিটগুলো তৈরি করা হয়েছে। এক্সিকিউটিভ ক্লাসে ঘোরানোর মতো (Rotating) আসন এবং পর্যাপ্ত লেগ-রুম রয়েছে।
বিশেষ সক্ষমদের জন্য সুবিধা (Divyangjan Friendly): হুইলচেয়ার ব্যবহারকারীদের জন্য বিশেষ দরজা, ব্রেইল সাইনেজ এবং প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে ট্রেনের ব্যবধান কমাতে বিশেষ রিট্র্যাক্টেবল স্টেপ বা সিঁড়ির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
অন্যান্য আধুনিক ফিচার: বায়ো-ডাইজেস্টার টয়লেট, ওয়াই-ফাই ভিত্তিক ইনফোটেইনমেন্ট সিস্টেম, এলসিডি স্ক্রিন ডিসপ্লে, মাল্টি-ল্যাঙ্গুয়েজ অ্যানাউন্সমেন্ট সিস্টেম এবং উচ্চমানের এসি (HVAC) ইউনিট যা যেকোনো আবহাওয়ায় ট্রেনের ভেতর আরামদায়ক তাপমাত্রা বজায় রাখবে।
ট্রায়াল রান এবং পরিষেবা চালুর সম্ভাব্য সময়সূচি:
ট্রায়াল রান: রেল মন্ত্রকের পরিকল্পনা অনুযায়ী, মুম্বাই-আহমেদাবাদ হাই-স্পিড রেল করিডোরের সুরাত থেকে বাপি (বা সুরাত-বিলিমোরা) অংশের প্রায় ১০০ কিলোমিটারের মধ্যে মে-জুন ২০২৭ নাগাদ এই B28 ট্রেনের ট্রায়াল বা পরীক্ষামূলক দৌড় শুরু হতে পারে।
বাণিজ্যিক পরিষেবা: ২০২৭ সালের আগস্ট মাসের মধ্যেই এই সেকশনে বাণিজ্যিক অপারেশন বা যাত্রী পরিষেবা চালুর লক্ষ্যমাত্রা ধার্য করা হয়েছে।
স্কুইজ টেস্ট সফলভাবে উত্তীর্ণ হওয়ার পর এখন এই প্রোটোটাইপ ট্রেনটির পরবর্তী নির্মাণ ও ফিনিশিংয়ের কাজ আরও দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলেছে, যা ভারতের রেল পরিবহন ইতিহাসে এক নতুন যুগের সূচনা করতে চলেছে।