বিশ্বজিৎ নস্কর,নিজস্ব সংবাদদাতা: চিকিৎসার নামে প্রতারণার অভিযোগ ঘিরে তদন্ত শুরু হয়েছিল। সেই তদন্তের সূত্র ধরেই এবার উঠে এল স্থানীয় রাজনীতির কয়েকটি পরিচিত নাম। তিন অভিযুক্ত ভুয়ো চিকিৎসককে গ্রেপ্তারের পর এবার বারুইপুরে গ্রেপ্তার হলেন তৃণমূল কংগ্রেসের দুই কাউন্সিলর এবং বারুইপুর পূর্বের বিধায়ক বিভাস সর্দারের ঘনিষ্ঠ এক নেতা। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক মহলে শুরু হয়েছে নতুন জল্পনা। তদন্তের পরিধি আরও বাড়বে কি না, এখন সেদিকেই নজর।

ধৃত দুই কাউন্সিলর হলেন বারুইপুর পুরসভার ১৬ নম্বর ওয়ার্ডের আশিস দেবরায় এবং ৬ নম্বর ওয়ার্ডের বিকাশ দত্ত। তাঁদের পাশাপাশি গ্রেপ্তার হয়েছেন বিধায়ক বিভাস সর্দারের ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত এক নেতাও। পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, ভুয়ো চিকিৎসক-কাণ্ডে ধৃত তিন ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদ করার পরই এই তিনজনের নাম তদন্তকারীদের সামনে আসে। এরপর তাঁদের ভূমিকা খতিয়ে দেখে গ্রেপ্তারের পদক্ষেপ করা হয়।
এই ঘটনার সূত্রপাত বারুইপুরের তিন ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারকে কেন্দ্র করে। তপন কুমার বৈরাগী, বাসুদেব নস্কর এবং আশিস কুমার বড়াল এই তিনজনের বিরুদ্ধে বৈধ চিকিৎসা সংক্রান্ত ডিগ্রি না থাকা সত্ত্বেও রোগীদের চিকিৎসা করার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে তাঁরা নিজেদের চিকিৎসক হিসেবে পরিচয় দিয়ে রোগীদের চিকিৎসা করতেন। শুধু চিকিৎসাই নয়, টাকার বিনিময়ে মেডিক্যাল সার্টিফিকেট দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তাঁদের বিরুদ্ধে। এমনকী মৃত ব্যক্তিদের নামে ডেথ সার্টিফিকেট দেওয়ার অভিযোগ সামনে এসেছে। যদিও এই সমস্ত অভিযোগের সত্যতা তদন্তের মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে।
তদন্তকারীদের দাবি, ধৃত তিন অভিযুক্তকে জিজ্ঞাসাবাদ করার সময় স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে তাঁদের যোগাযোগের বিষয়টি সামনে আসে। অভিযোগ, বিভিন্ন সময়ে রোগীদের ওই অভিযুক্তদের কাছে পাঠানোর ক্ষেত্রে কয়েকজন জনপ্রতিনিধির ভূমিকা ছিল। সেই সূত্র ধরেই দুই কাউন্সিলর এবং বিধায়ক-ঘনিষ্ঠ নেতার ভূমিকা খতিয়ে দেখতে শুরু করে পুলিশ। পরবর্তী সময়ে তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয় বলে জানা গিয়েছে।
তবে ঠিক কী কারণে রোগীদের ওই ব্যক্তিদের কাছে পাঠানো হত, এর পিছনে কোনও আর্থিক লেনদেন ছিল কি না, কিংবা অভিযুক্ত জনপ্রতিনিধিরা গোটা চক্রের কার্যকলাপ সম্পর্কে কতটা জানতেন এই প্রশ্নগুলির উত্তর এখনও স্পষ্ট নয়। তদন্তকারীরা এই বিষয়গুলিই খতিয়ে দেখছেন। পাশাপাশি, ভুয়ো চিকিৎসক চক্রের সঙ্গে আর কারও যোগাযোগ রয়েছে কি না, তা জানারও চেষ্টা চলছে।
অন্যদিকে, বারুইপুরের কীর্তনখোলা শ্মশান দুর্নীতি-কাণ্ড ঘিরে রাজনৈতিক চাপানউতোর ইতিমধ্যেই চলছিল। ওই ঘটনায় বিজেপির তরফে একাধিক অভিযোগ তোলা হয়েছে। তারই মধ্যে ভুয়ো চিকিৎসক মামলায় তৃণমূলের দুই কাউন্সিলর ও এক বিধায়ক-ঘনিষ্ঠ নেতার গ্রেপ্তারি নতুন করে রাজনৈতিক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তবে শ্মশান-কাণ্ডের সঙ্গে এই মামলার কোনও সরাসরি যোগ রয়েছে, এমন তথ্য এখনও সামনে আসেনি।
চিকিৎসার মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে ভুয়ো পরিচয় ব্যবহার করে রোগীদের চিকিৎসা করার অভিযোগ স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগ বাড়িয়েছে। তার সঙ্গে মেডিক্যাল সার্টিফিকেট ও ডেথ সার্টিফিকেট দেওয়ার অভিযোগ যুক্ত হওয়ায় তদন্তের গুরুত্ব আরও বেড়েছে। পুলিশের তদন্তে এখন মূল প্রশ্ন, এই চক্র কতদিন ধরে সক্রিয় ছিল এবং এর পিছনে আর কোনও ব্যক্তি বা সংগঠিত নেটওয়ার্ক রয়েছে কি না।
তিন অভিযুক্ত চিকিৎসক থেকে শুরু করে রাজনৈতিক পরিচিতি থাকা তিন ব্যক্তির গ্রেপ্তারি পরপর এই ঘটনাপ্রবাহে বারুইপুরের ভুয়ো চিকিৎসক-কাণ্ড নতুন মাত্রা পেয়েছে। এখন তদন্তের পরবর্তী পর্যায়ে কী তথ্য উঠে আসে, ধৃতদের সঙ্গে অভিযুক্ত চিকিৎসকদের যোগাযোগের প্রকৃতি কতটা স্পষ্ট হয়, সেদিকেই নজর রয়েছে। অভিযোগের সত্যতা এবং প্রত্যেকের নির্দিষ্ট ভূমিকা তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই সামনে আসবে।