মাম্পি রায়, সাংবাদিকঃ জেন জি-র বিক্ষোভে নেপালের প্রশাসনিক ক্ষমতার রদবদলের সাক্ষী ছিল গোটা বিশ্ব। তার আগে বাংলাদেশে বিক্ষোভের মুখে ক্ষমতা ছেড়ে দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এবার ঠিক একইরকম জেন জি আন্দোলন দেখা গেল লাদাখে। লাদাখকে রাজ্য হিসাবে স্বীকৃতি দিতে হবে। লাদাখকে সংবিধানের ষষ্ঠ তফসিলের আওতাভুক্ত করে পূর্ণ রাজ্যের মর্যাদা দেওয়া হোক। এমনই দাবি তুলে বুধবার লাদাখের লেহতে বিক্ষোভ শুরু হয়। সেই বিক্ষোভ এতটাই সহিংস হয়ে ওঠে যে বিক্ষোভকারী এবং প্রশাসনের সংঘর্ষে ৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। অন্তত ৭০জন জখম হয়েছেন।

লাদাখকে ভিন্ন রাজ্যের মর্যাদা দেওয়ার দাবিতে গত কয়েক বছর ধরে আন্দোলন চলছে। সেই আন্দোলনের অন্যতম মুখ সোনম ওয়াংচুক। তাঁর বক্তব্য, লাদাখকে সংবিধানের ষষ্ঠ তফসিলের আওতাভুক্ত করে পূর্ণ রাজ্যের মর্যাদা দেওয়া হোক। সেজন্য একটি পৃথক পাবলিক সার্ভিস কমিশন গঠন করতে হবে। পাশাপাশি লেহ এবং কার্গিল জেলার জন্য পৃথক পৃথক লোকসভা আসন তৈরি করতে হবে। এমনই নানানরকম দাবি তুলে বারবার সরব হয়েছেন থ্রু ইডিয়টস সিনেমায় ‘র্যাঞ্চো’ হিসেবে যার চরিত্র ফুটিয়ে তোলা হয়েছে, বাস্তবের সেই মানুষটি। সেই ব়্যাঞ্চো অর্থাৎ বাস্তবের সোনম ওয়াংচুক বেশ কয়েকবার অনশনে বসেছেন। বুধবার একই ইস্যুতে আন্দোলনের ডাক দিয়েছে লেহ অ্যাপেক্স বডির যুব শাখা। সেই আন্দোলনই সহিংস হয়ে ওঠে। যার নিয়ন্ত্রণ হাতের বাইরে চলে যায়। সোনম ওয়াংচুক জানাচ্ছেন, মানুষের মনে দীর্ঘদিন ধরে ক্ষোভ জমাট বাঁধছিল। এই বিক্ষোভ তারই বহিঃপ্রকাশ। তবে কোনও সহিংস আন্দোলনে তাঁর সমর্থন নেই বলে স্পষ্ট করে দিয়েছেন সোনম ওয়াংচুক।

এদিকে কেন্দ্রের দাবি, লাদাখের পরিস্থিতি নিয়ে নিরন্তর আলোচনা প্রক্রিয়া চলছে। সেই সঙ্গে লাদাখের দাবিদাওয়া এবং সাংবিধানিক অধিকারের প্রতি তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলেও মনে করিয়ে দিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক জানাচ্ছে, ১০ সেপ্টেম্বর অনশন শুরু করেন সোনম ওয়াংচুক। তাঁর দাবিগুলি ইতিমধ্যেই উচ্চতর কমিটিতে বিবেচনাধীন। লাদাখে তফসিলি উপজাতি সংরক্ষণ ৪৫% থেকে ৮৪% করেছে সরকার। কাউন্সিলগুলিতে মহিলাদের জন্য এক তৃতীয়াংশ সংরক্ষণ দেওয়া হয়েছে। আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে ভোটি এবং পুরগি ভাষাকে। ১,৮০০ পদে নিয়োগও শুরু হয়েছে। এরপরই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের দাবি, আরব বসন্ত এবং জেন জি আন্দোলনের কথা উল্লেখ করে জনতাকে উস্কানি দিয়েছেন ওয়াংচুক। হিংসার মাঝে অনশন ভেঙে নিজের গ্রামে ফিরে যান ওয়াংচুক। সব জেনেও পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টাই করেননি সোনম, দাবি কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের।

কেন্দ্রের দাবি, একাধিক নেতা বার বার আবেদন করা সত্ত্বেও অনশন প্রত্যাহার না করা, ‘আরব বসন্ত’, নেপালের ‘জেন জ়ি’ প্রসঙ্গ তুলে লাদাখের জনগনকে বিভ্রান্ত করা হয়েছে। কেন্দ্র আরও জানাচ্ছে, সোনমের কথায় উদ্বুদ্ধ হয়েই জনতার একটি অংশ অনশনস্থল ছেড়ে রাজনৈতিক দলের কার্যালয় ও সরকারি দফতরে হামলা চালায়। ইচ্ছাকৃত ভাবেই অশান্তি তৈরি করা হয়েছে বলে জানাচ্ছে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক।

যদিও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের দাবি মানতে নারাজ সোনম। তিনি জানাচ্ছেন, বুধবার ছিল আমাদের অনশনের ১৫তম দিন। ২০ তারিখ নাগাদ প্রশাসন বলে ৫ অক্টোবর হবে বৈঠক। তার মানে সরকার চাইছিল অনশনমঞ্চেই প্রাণ হারাক লাদাখবাসী। ইচ্ছাকৃতভাবে বৈঠকের জন্য দেরি করা হচ্ছি। এর ফলে আরও ক্ষুব্ধ হতে থাকেন লাদাখবাসী। স্থানীয় প্রশাসনকেও জানিয়েছিলাম যে, যুব সম্প্রদায় বিক্ষুব্ধ। তারপরও ওরা কোনও সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেয়নি। এখানেই শেষ নয়, এই অশান্তির জন্য বাইরে থেকে উস্কানি রয়েছে বলেও অভিযোগ তুলছেন খোদ সোনম ওয়াংচুক। সবমিলিয়ে অশান্তির দায় কার? যিনি তিল তিল করে লাদাখকে এতটা উন্নয়নের মুখ দেখালেন তাঁর, নাকি সরকারের ? লাদাখবাসীর দাবি কি পূরণ হবে ? সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।