স্বাগতা চন্দ্র সাহা, সাংবাদিক : একদিকে জাহাঙ্গির অন্যদিকে শাহজাহান। না না মুঘল সম্রাজ্যের ইতিহাস নিয়ে কাটাছেঁড়া নয় তৃণমূল দলের পেশিশক্তিদের কথা বলছি। ফলতায় পুনর্নির্বাচনের আগেই তো লেজ গুটিয়ে পালিয়েছেন জাহাঙ্গির। এবার একে একে বেরোচ্ছে তাঁর কীর্তিনামা। শাহজাহানের মতোই সে রাজ্যপাট সাজাতে শুরু করেছিল। কিন্তু মহীরূহ হওয়ার আগেই ফলতায় বদলে গেছে ছবি। অন্যদিকে বিজেপি ক্ষমতায় আসতেই সন্দেশখালির বুক থেকে শাহজাহানকে সমূলে উৎপাটনের কাজ শুরু হয়ে গেছে। শাহজাহান গরাদের অন্দরে যেতেই তার ডানা ছাঁটার কাজ শুরু হয়েছিল। এবার শাহজাহানের নাম মুছতে চলছে অপারেশন। শাহজাহান অধ্য়ায়ের সমাপ্তির অপারেশন।

সন্দেশখালির প্রতিবাদী মুখ রেখা পাত্র বিধানসভা ভোটে হিঙ্গলগঞ্জ আসনে লড়লেও তাঁর শপথ ছিল ভোটে জিতলেই শাহজাহানের কুকীর্তির চরম শাস্তি মিলবে। এমনকি তাকে তিহার জেলে পাঠানোর হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীও বাংলায় প্রচারে এসে শাহজাহানের কেস ফাইল ফের খোলার কথা বলেছিলেন। ২৬ শের বিধানসভা ভোটে ক্ষমতাচ্যুত তৃণমূল। বাংলার মসনদে বিজেপি। অন্যদিকে হিঙ্গলগঞ্জ সহ উঃ ২৪ পরগনায় ৩৩ আসনের মধ্যে ২৩টিতে জয় পেয়েছে বিজেপি। সন্দেশখালিতেও জয় পেয়েছে পদ্ম শিবির। অতএব শাহজাহানের ডেরায় পদ্মচাষ হওয়ায় এবার শুরু অ্যাকশন। ২০২৪ সালে ৫ই জানুয়ারি রেশন দুর্নীতির তদন্ত করতে গিয়ে সন্দেশখালি তৃণমূল নেতা শেখ শাহজাহানের অনুগামীদের হাতে আহত হন ই ডি র আধিকারিকরা। সেই ঘটনায় বেশ কিছু শেখ শাহাজাহান ঘনিষ্ঠরা পলাতক ছিল। প্রায় ১৪৩ জনের নামে অভিযোগ দায়ের হয়েছিল। তারে বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হলেও এতদিন কোনও ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়নি। এবার যেন পের তেড়েফুঁড়ে উঠেছে পুলিশ প্রশাসন। ন্যাজাট থানার পুলিশ গোপন সূত্রে খবর পেয়ে দক্ষিণ ২৪ পরগনার সোনারপুর এলাকা থেকে বসিরহাট তৃণমূল সাংগঠনিক জেলার সভানেত্রী তথা সন্দেশখালি ১ নম্বর পঞ্চায়েত সমিতির সভানেত্রী সবিতা রায়, ও সন্দেশখালি ১ নম্বর ব্লক তৃণমূলের সভানেত্রী তথা সন্দেশখালি এক নম্বর পঞ্চায়েত সমিতির কর্মাধ্যক্ষ মিঠু সর্দার কে গ্রেফতার করে। রাজ্যের পালা বদল হতেই একের পর এক তৃণমূল নেতা-নেত্রী গ্রেপ্তার হওয়ায়” আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি হয়েছে গোটা বসিরহাট জুড়ে। সূত্রের খবর শেখ শাহজাহানের বাড়ির সামনে যখন ইডির ওপরে হামলা চালায় সেই সময় যে ফুটেজ পাওয়া গেছিল সেই ফুটেজে এই দুই তৃণমূল নেত্রীর ছবি দেখা গিয়েছিল। তাদেরকে বারবার সিজিও কমপ্লেক্সে ডাকা হলেও তারা হাজিরা দেননি। এবার একেবারে ন্যাজাট থানার পুলিশের জালে। পুলিশ সূত্রে খবর, ইডি হামলা মামলায় তাঁদের ভূমিকা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ধৃতদের জিজ্ঞাসাবাদ করে হামলার ঘটনায় আরও কারা জড়িত ছিলেন, তা জানার চেষ্টা করছেন তদন্তকারীরা। সন্দেশখালির এই ঘটনা নিয়ে জাতীয় রাজনীতিতেও ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। শাহজাহান ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে লুকআউট সার্কুলার জারি করে ইডি। এরপর শেখ শাহজাহানের বিরুদ্ধে জমে থাকা ক্ষোভ আছড়ে পরে রাস্তায়। দফায় দফায় অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে সন্দেশখালি। শাহজাহান ঘনিষ্ঠদের পোলট্রি ফার্ম, বাড়ি ও অফিসে ভাঙচুর চলে। সন্দেশখালির বাসিন্দাদের চরম ক্ষোভের মুখে, ইডি-র ওপর হামলার ৪৮ দিন পর সেখানে পৌঁছোন রাজ্য পুলিশের DG রাজীব কুমার। এর মধ্য়ে কলকাতা হাইকোর্ট স্পষ্ট করে দেয়, শেখ শাহজাহানকে গ্রেফতার করার ওপর আদালতের কোনও স্থগিতাদেশ নেই। এই প্রেক্ষাপটে ED-র ওপর হামলার ৫৫ দিন পর মিনাখাঁ থেকে শেখ শাহজাহানকে গ্রেফতার করে রাজ্য পুলিশ। গ্রেফতারের পরেও শাহজাহানের দাপট কমেনি। তার বিরুদ্ধে ওঠে বিস্ফোরক অভিযোগ।
জেলের গরাদের ভিতর থাকলেও শাহজাহানের বিরুদ্ধে উঠেছিল খুনের পরিকল্পনার অভিযোগ। প্রেসিডেন্সি জেলে বন্দি থাকা অবস্থায় সন্দেশখালির মূল অভিযুক্ত শেখ শাহজাহান মোবাইল ফোনের মাধ্যমে বাইরে অপরাধমূলক নেটওয়ার্ক চালাচ্ছে এবং সাক্ষীকে খুনের ছক কষছে বলে গুরুতর অভিযোগ ওঠে। ভোলানাথ ঘোষ নামে এক ব্যক্তি অভিযোগ করেন, জেল থেকে ফোন করে শাহজাহান ও তাঁর স্ত্রী মিলে তাঁকে খুনের চক্রান্ত করেন। গত বছরের ডিসেম্বরে শাহজাহানের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে যাওয়ার পথে লরির ধাক্কায় প্রাণ হারান ভোলানাথের ছেলে। আর গত শুক্রবার প্রেসিডেন্সি জেল থেকে ২৩টি মোবাইল উদ্ধারের পর ভোলানাথ বলছেন, তাঁর অভিযোগই ঠিক ছিল। শাহজাহানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর কাছে আবেদন জানান তিনি। নবান্নে সাংবাদিক বৈঠক করে মুখ্যমন্ত্রী জানান, প্রেসিডেন্সে জেলে গোপনে অভিযান চালিয়ে ২৩টি মোবাইল বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। সংশোধনাগারের দুই কারা আধিকারিককে সাসপেন্ড করা হয়েছে। অতএব ভোলানাথ ঘোষ যে অভিযোগ করেছিলেন, তা সত্যি প্রমাণিত হল। শাহজাহান জেলের মধ্যে নেটওয়ার্ক চালাত। তবে সন্দেশখালি কাণ্ডে এবার কড়া অবস্থান নিতে চলেছে বিজেপি সরকার।
রাজনৈতিক মহলের মতে, বাংলায় ক্ষমতার অলিন্দে পরিবর্তন আসতেই সন্দেশখালির পুরো সমীকরণ ওলটপালট হয়ে গিয়েছে। এতদিন যে সমস্ত নেতা-নেত্রীদের দাপট চলত, আজ তাঁরাই পুলিশের ভয়ে ভিন জেলায় পালিয়ে গিয়েও শেষরক্ষা করতে পারছেন না। সন্দেশখালি ১ নম্বর পঞ্চায়েত সমিতির সভানেত্রী ও কর্মাধ্যক্ষ পদমর্যাদার দুই নেত্রীর এই নাটকীয় পতন ও গ্রেফতারি বসিরহাট মহকুমার শাসক শিবিরে বিশাল ধাক্কা দিল বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল।