বিশ্বজিৎ নস্কর, নিজস্ব সংবাদদাতা : একদিকে শিক্ষক দিবস। অন্যদিকে বাংলার শিক্ষা ও সমাজ সংস্কারের অন্যতম পথিকৃৎ ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের মূর্তি পড়ে রয়েছে জঙ্গল-ঝোপের মধ্যে। শিক্ষক দিবসের দিনেই বারুইপুরে সামনে এল এমনই এক ছবি, যা দেখে ক্ষোভে ফুঁসছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। অভিযোগ, নির্দিষ্ট জায়গা থেকে বিদ্যাসাগরের মূর্তি সরিয়ে পাশে থাকা জঙ্গল-ঝোপের মধ্যে ফেলে দেওয়া হয়েছে। অথচ ঘটনাস্থলের পাশ দিয়েই প্রতিদিন যাতায়াত করছেন অসংখ্য মানুষ। তারপরও কেন এতদিন বিষয়টি নিয়ে কোনও পদক্ষেপ করা হল না, তা নিয়ে উঠছে প্রশ্ন।

ঘটনাটি বারুইপুর পুরসভার ১১ নম্বর ওয়ার্ডের বিদ্যাসাগর শিশু উদ্যানের। স্থানীয়দের দাবি, শিশুদের বিনোদন ও খেলাধুলার জন্য তৈরি করা হয়েছিল এই উদ্যান। সেই পার্কেই স্থাপন করা হয়েছিল ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের মূর্তি। কিন্তু বর্তমানে সেই মূর্তির স্থান হয়েছে জঙ্গল-ঝোপে। শিক্ষক দিবসের মতো দিনে এমন ছবি প্রকাশ্যে আসতেই এলাকায় তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে।
আরও তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, যে জায়গায় এই ঘটনা ঘটেছে, সেখান থেকে বারুইপুর মহকুমা শাসকের অফিস এবং বারুইপুর পুরসভা কার্যত ঢিল ছোড়া দূরত্বে। অর্থাৎ প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ দফতরের এত কাছে একটি পার্কের মধ্যে বিদ্যাসাগরের মূর্তি কীভাবে এমন অবস্থায় পড়ে থাকল, তা নিয়েই প্রশ্ন তুলছেন স্থানীয়রা। পুরসভা কর্তৃপক্ষের নজরদারি ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, ২০২০ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর বিদ্যাসাগর শিশু উদ্যানে বিদ্যাসাগরের মূর্তিটি উদ্বোধন করা হয়েছিল। তৎকালীন ১১ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মোজাফফর আহমেদ মূর্তিটির উদ্বোধন করেন। শিশুদের জন্য একটি সুন্দর পরিবেশ তৈরি করার পাশাপাশি বাংলার অন্যতম শ্রদ্ধেয় শিক্ষাবিদের স্মৃতিকে সামনে রাখার উদ্দেশ্যেই সেখানে মূর্তি স্থাপন করা হয়েছিল বলে জানা যায়। কিন্তু কয়েক বছরের মধ্যেই সেই মূর্তির এমন পরিণতি কেন, তা নিয়ে ক্ষোভ ছড়িয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের বক্তব্য, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বাঙালির কাছে শুধুমাত্র একজন শিক্ষাবিদ নন। বাংলার সমাজ সংস্কার, নারীশিক্ষার প্রসার এবং শিক্ষার আধুনিকীকরণে তাঁর ভূমিকা ইতিহাসের পাতায় উজ্জ্বল। বিধবা বিবাহের পক্ষে আন্দোলন থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের মধ্যে শিক্ষার প্রসার—বহু ক্ষেত্রে তাঁর অবদান স্মরণীয়। তাঁর মতো একজন মনীষীর মূর্তি যদি একটি সরকারি পার্কে জঙ্গল-ঝোপের মধ্যে পড়ে থাকে, তাহলে সেটি শুধু অবহেলার ছবি নয়, বরং প্রশাসনিক দায়িত্ববোধ নিয়েও বড় প্রশ্ন তুলে দেয়।
ঘটনাটি ঘিরে একাধিক প্রশ্ন সামনে এসেছে। কে বা কারা মূর্তিটি নির্দিষ্ট জায়গা থেকে সরাল? কী কারণে সরানো হল? মূর্তি সরানোর জন্য কি পুরসভার কোনও অনুমতি নেওয়া হয়েছিল? যদি কোনও সংস্কার বা নির্মাণকাজের জন্য মূর্তিটি সরানো হয়ে থাকে, তাহলে সেটিকে নিরাপদ জায়গায় রাখা হল না কেন? আর যদি পুরসভার অনুমতি ছাড়াই কেউ মূর্তিটি সরিয়ে থাকে, তাহলে এখনও পর্যন্ত কোনও তদন্ত বা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না, সেই প্রশ্নও উঠছে।
বাসিন্দাদের আরও অভিযোগ, পার্কটির রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নিয়েও নজরদারি প্রয়োজন। একটি শিশু উদ্যানের ভিতরে নিয়মিত পরিচর্যা না হলে সেখানে আগাছা ও জঙ্গল তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু সেই জঙ্গল-ঝোপের মধ্যে বিদ্যাসাগরের মূর্তি পড়ে থাকার বিষয়টি অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক বলেই মনে করছেন তাঁরা।
সবচেয়ে বেশি ক্ষোভ তৈরি হয়েছে শিক্ষক দিবসের দিন এই ছবি সামনে আসায়। ৫ সেপ্টেম্বর দেশের বিভিন্ন প্রান্তে শিক্ষক ও শিক্ষাবিদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয়। স্কুল-কলেজ থেকে শুরু করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানেই দিনটি নানা অনুষ্ঠানের মাধ্যমে পালন করা হয়। সেই দিনেই শিক্ষার প্রসারে আজীবন কাজ করে যাওয়া বিদ্যাসাগরের মূর্তি অবহেলায় পড়ে থাকার ছবি সামনে আসায় অনেকেই বিষয়টিকে প্রতীকী অবমাননা হিসেবেও দেখছেন।
স্থানীয়দের দাবি, অবিলম্বে মূর্তিটি উদ্ধার করে যথাযথ জায়গায় পুনঃস্থাপন করতে হবে। পাশাপাশি, কীভাবে মূর্তিটি ওই জায়গায় গেল, তা খতিয়ে দেখতে হবে। যদি কারও গাফিলতি বা ইচ্ছাকৃত পদক্ষেপের কারণে এমন ঘটনা ঘটে থাকে, তাহলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি উঠেছে।
প্রশ্ন উঠছে বারুইপুর পুরসভার ভূমিকা নিয়েও। পুরসভার অন্তর্গত একটি শিশু উদ্যানে এমন ঘটনা ঘটল, অথচ কর্তৃপক্ষের নজরে এল না কেন? প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ দফতর থেকে কয়েকশো মিটার দূরেই যদি বিদ্যাসাগরের মূর্তির এই দশা হয়, তাহলে শহরের অন্যান্য পার্ক ও পুর-সম্পত্তির রক্ষণাবেক্ষণ কতটা সঠিকভাবে হচ্ছে, তা নিয়েও প্রশ্ন থাকছে।
এখন স্থানীয়দের নজর পুরসভা ও প্রশাসনের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে। শিক্ষক দিবসের দিন সামনে আসা এই ছবি কি পুরসভার ঘুম ভাঙাবে? জঙ্গল-ঝোপ থেকে কি ফের সম্মানের সঙ্গে নিজের জায়গায় ফিরবেন বিদ্যাসাগর? নাকি বাংলার এই মহান শিক্ষাবিদের মূর্তিকে এভাবেই অবহেলার মধ্যে পড়ে থাকতে হবে—উত্তর খুঁজছে বারুইপুর।