রিয়া দাস, সাংবাদিক : ফের নতুন করে জোরালো হয়ে উঠেছে আমেরিকা-ইরান সংঘাতের অধ্যায়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সর্বশেষ শান্তি প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন আপাতত কোনও সমঝোতার পথে হাঁটার ইচ্ছা নেই তাঁর। বরং সামরিক ও কূটনৈতিক দুই পথই খোলা রেখে তিনি জোর দিয়েছেন একটাই বিষয়ে, উন্মাদদের হাতে পারমাণবিক অস্ত্র পৌঁছাতে দেওয়া যাবে না। তাঁর বক্তব্য থেকে স্পষ্ট যে, ইরানের হাতে পারমাণবিক অস্ত্র পৌঁছানো ঠেকাতেই আমেরিকার এই অবস্থান। ট্রাম্প জোর দিয়ে বলেন ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন পদক্ষেপ কোনও আক্রমণ নয় বরং এক সম্ভাব্য বিপর্যয়কে প্রতিহত করার উদ্যোগ। বিশেষ করে বি-২ স্পিরিট বোমারু বিমানের অভিযানের কথা উল্লেখ করে তিনি জানান, এই পদক্ষেপ না নিলে ইরান খুব শিগগিরই পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী হয়ে উঠতে পারত। তাঁর মতে, সেই পরিস্থিতিতে ইজরায়েল থেকে শুরু করে গোটা পশ্চিম এশিয়া ও ইউরোপ পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ত ধ্বংসের ছায়া। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, ইরানের সামরিক শক্তি এখন অনেকটাই ভেঙে পড়েছে। নৌবাহিনী, বায়ুসেনা এমনকি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও গুরুতরভাবে দুর্বল।

যুদ্ধের জন্য নির্ধারিত ৬০ দিনের সময়সীমা বাড়াতে হলে মার্কিন কংগ্রেসের অনুমোদনের প্রয়োজন ট্রাম্পের। এই পরিস্থিতিতে ট্রাম্প দাবি করেন যে, ইরানের বিরুদ্ধে আমেরিকার পদক্ষেপ একটি পারমাণবিক বিপর্যয় রোধ করেছে। এই উত্তেজনার মাঝেই মধ্যস্থতার ভূমিকায় এগিয়ে এসেছে পাকিস্তান। যারা ইরানের পক্ষ থেকে একটি শান্তি প্রস্তাব ওয়াশিংটনের কাছে পৌঁছে দেয়। কিন্তু সেই প্রস্তাবও প্রত্যাখান করে ট্রাম্প জানিয়ে দিয়েছেন, নির্ধারিত সময়ের আগে কোনওভাবেই মার্কিন বাহিনী পিছু হটবে না। তাঁর আশঙ্কা এখন পিছিয়ে এলে ভবিষ্যতে আরও বড় বিপদের মুখে পড়তে হতে পারে। পাশাপাশি ইরানের নেতৃত্বকে অসংগঠিত বলে কটাক্ষ করে তিনি দাবি করেন তেহরানের অভ্যন্তরেই চলছে চরম বিশৃঙ্খলা। অন্যদিকে, মার্কিন সামরিক কৌশলেও দেখা যাচ্ছে নতুন রূপ। বড় আকারের যুদ্ধের বদলে ছোট কিন্তু লক্ষ্যভেদী হামলার মাধ্যমে ইরানের গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামো ধ্বংস করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
এদিকে মার্কিন রিপোর্ট অনুযায়ী, ইরানের বিরুদ্ধে আমেরিকা যদি ফের যুদ্ধ শুরু করে সেক্ষেত্রে নয়া যে পরিকল্পনা রয়েছে তা হল, ইরানের পরিকাঠামো ধ্বংস করতে সেখানে ছোট অথচ মারণ হামলা চালানো। সেন্টকমের আশা এটি তেহরানের ওপর চাপ তৈরি করবে এবং তাকে আলোচনার টেবিলে বসতে বাধ্য করবে। মার্কিন বাহিনী আশা করছে ব্যাপকহারে বোমা বর্ষণ শুরু হলে শান্তি আলোচনার শর্ত নিয়ে আলোচনার সময় ইরান পরমাণু ইস্যুতে আরও নমনীয় হতে পারে। অন্যদিকে যুদ্ধের বাইরে আরেকটি লড়াই শুরু হয়েছে ইরানের ভেতরেই। প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেস্কিয়ান এবং বিদেশমন্ত্রী আব্বাস আরাঘাচির মধ্যে মতবিরোধ চরমে উঠেছে বলে খবর। অভিযোগ উঠেছে, গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে প্রেসিডেন্টের নির্দেশ অমান্য করেছেন আরাঘাচি। এমনকি ইসলামিক রেভল্যশনারি গার্ড কর্পসের প্রভাবেই কাজ করেছেন তিনি। একাধিক রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে, গত দুই সপ্তাহ ধরে অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত আরাঘাচি গোপন করেছেন প্রেসিডেন্টের কাছে। বহু তথ্য তাঁকে দেওয়া হয়নি। একই সঙ্গে স্পিকার মহম্মদ বাঘের গালিবাফের বিরুদ্ধেও উঠেছে অভিযোগ। যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
যুদ্ধ পরিস্থিতিতে ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে এই অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব নতুন নয়। সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনেইয়ের মৃত্যুর পর থেকেই ক্ষমতার ভারসাম্য নড়ে যায়। দায়িত্বে আসেন মোজতবা খামেনেই। নতুন নেতৃত্ব, মতপার্থক্য এবং প্রশাসনিক টানাপোড়েন মিলিয়ে ইরানের রাজনীতিতে তৈরি হয়েছে অস্থিরতার আবহ। বলাই যায়, বিশ্ব এখন এক অনিশ্চিত সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। যুদ্ধের আগুন কি আরও ছড়িয়ে পড়বে নাকি শেষ মুহূর্তে আলোচনার মাধ্যমে যুদ্ধ থামবে। সেই প্রশ্নের উত্তর এখনও অজানা।