স্বাগতা চন্দ্র সাহা, সাংবাদিক : শুভেন্দু অধিকারীর আপ্তসহায়ক বলে কথা তাই চন্দ্রনাথ রথের কোনও কিছুই অজানা ছিল না। সবই ছিল তাঁর নখদর্পণে। তিল তিল করে ফাইলবন্দি করেছিলেন নানা তথ্য। সেই তথ্য যদি ফাঁস হয়ে যায়। সেই ভয়েই কি পরিকল্পনা করে খুন শুভেন্দু অধিকারীর আপ্ত সহায়ক চন্দ্রনাথ রথকে। কার দুর্নীতির হদিশ ছিল চন্দ্রনাথের ফাইলে। পরিবারের তরফে করা হয়েছে গুরুতর অভিযোগ। বাম নেতা তথা বিশিষ্ট আইনজীবী বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্যও চন্দ্রনাথ হত্যা রহস্যের কিনারায় মামলা লড়তে রাজি। কিন্তু তাঁর প্রশ্ন আদৌ কি এই হত্যা রহস্যের কিনারা সম্ভব? শুভেন্দু অধিকারীর আগের আপ্ত সহায়ক থেকে দেহরক্ষীদের হত্যার কিনারা হয়নি কেন? প্রশ্ন তুলেছেন বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য। তবে কি শুভেন্দু অধিকারীর আপ্ত সহায়ক হলে রহস্যমৃত্যু অবধারিত? এই নিয়েও সোশ্যাল মাধ্যমে জোর চর্চা।

একজন দক্ষ আপ্ত সহায়ক বলতে যা বোঝায় তাই ছিলেন চন্দ্রনাথ রথ। তাঁকে পূর্ব পরিকল্পনা করে গুলি করা হয়েছে বলেই অনুমান। স্থানীয় সূত্রে দাবি, বাড়িতে যাতায়াতের কোনও নির্দিষ্ট সময় ছিল না চন্দ্রনাথের। প্রয়োজন অনুসারে বিভিন্ন সময় বাড়ি থেকে বেরোতেন বা বাড়ি ফিরতেন। বুধবার রাতে ওই সময়ে তিনি যে ওই জায়গাতেই থাকবেন, সেই সংক্রান্ত নিখুঁত তথ্য দুষ্কৃতীদের কাছে ছিল। ছ’ঘণ্টা ধরে চারচাকার গাড়ি নিয়ে এলাকায় রেইকিও করা হয়েছিল। কে এই তথ্য দুষ্কৃতীদের দিলেন, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্তের প্রাথমিক সূত্রগুলি জুড়ে পুলিশের অনুমান, তাৎক্ষণিক কোনও ঘটনার প্রেক্ষিতে নয়, অন্তত এক থেকে দেড় মাস আগে এই হত্যার পরিকল্পনা করা হয়েছিল।পরিবারে মা, ভাই, ভাইয়ের স্ত্রী ও ছোট ভাইঝিকে নিয়ে থাকতেন চন্দ্রনাথ। বাবা ২০২৪ সালে প্রয়াত হন। বর্তমানে কাজের সুবিধার জন্য মধ্যমগ্রামে ভাড়া বাড়িতে থাকতেন চন্দ্রনাথ। ঘটনার পর থেকেই চন্দ্রনাথের পরিবার ও ঘনিষ্ঠ মহলের পক্ষ থেকে একাধিক গুরুতর অভিযোগ উঠতে শুরু করেছে। প্রথমত চন্দ্রনাথের মৃত্যুর পরই তাঁর মা অভিযোগ করেন তাঁর ছেলের ফোনে হুমকি ফোন আসত। ছেলের ফোনে কথাবার্তা দেখেই আন্দাজ করেছিলেন তিনি। কে ফোন করত চন্দ্রনাথকে। তাঁদের আরও দাবি, শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে কাজ করার সুবাদে তৃণমূল সরকারের আমলে বালি চুরি-সহ বিভিন্ন বেআইনি কার্যকলাপের গুরুত্বপূর্ণ নথি চন্দ্রনাথের কাছে ছিল। বিজেপি সরকার ক্ষমতায় এলে সেই সমস্ত তথ্য প্রকাশ্যে এলে বহু প্রভাবশালী নেতা ও দুষ্কৃতীদের সমস্যায় পড়তে হতে পারত বলেও অভিযোগ। প্রমাণ লোপাট করার হুমকি আসতো চন্দ্রনাথের ফোনে। চন্দ্রনাথ রথের মা হাসিরানি রথের দাবি বিজেপি ক্ষমতায় এসেছে বলেই তাঁর ছেলেকে মরতে হল। ঘটনার দিন মধ্যমগ্রামে কেন গিয়েছিলেন চন্দ্রনাথ। সূত্র মারফত জানা যাচ্ছে, নতুন কোনও কাজের দায়িত্ব পেয়েছিলেন চন্দ্রনাথ। আর সেই দায়িত্ব বুঝে নিতেই গিয়েছিলেন তিনি। শুভেন্দু অধিকারীর যাবতীয় কাজকর্ম করতেন চন্দ্রনাথ। কলকাতার সব কাজও তিনিই সামলাতেন। এটাই বোধহয় তাঁর জীবনে কাল হল।
অন্যদিকে আরও এক সূত্রের দাবি,যেমন ২০১৩ তে যান প্রদীপ ঝা, ২০১৮ তে প্রাক্তন দেহরক্ষী শুভব্রত চক্রবর্তী, ২০২১ এ পুলক লাহিড়ী এবং ২০২৬ এ চন্দ্রনাথ। এই ন্যারেটিভ ছড়িয়ে দিয়ে তৃণমূল কংগ্রেস শুভেন্দুকেই এই মৃত্যুর সঙ্গে জড়িয়ে দিতে চাইছে বলে অভিযোগ করেছে বিজেপি নেতৃত্ব। এছাড়াও রাজনৈতিক মহলে এই ঘটনায় শুরু হয়েছে গুঞ্জন। তাদের মতে পুলিশ রিপোর্ট বলছে ২০১৩ সালে প্রদীপ ঝা মারা গিয়েছিলেন অতিরিক্ত মদ্যপানের কারণে।২০১৮ তে ফের শুভব্রতর মৃত্যুতে জল ঘোলা হয়েছিল এবং শুভব্রতকে পুলিশ ব্যারাকে মাথায় গুলিবিদ্ধ অবস্থায় পাওয়া গিয়েছিল। এই খুনের ঘটনার সময় শুভেন্দু অধিকারী তৃণমূলে। শুরু হয় সিআইডি তদন্ত এবং তদন্ত করে সিআইডি রিপোর্ট পেশ করে যে শুভব্রতর মৃত্যু আত্মহত্যা ছাড়া কিছুই নয়। রাজনৈতিক মহলের একাংশের দাবি, ২০১৮ তে শুভেন্দু ছিলেন তৃণমূলে।
২০২০ তে বিজেপি যোগ দেওয়ার পরেও তদন্তে কোনও অগ্রগতি হয়নি। ২০২৬ যখন বিজেপি সরকার ক্ষমতায় , নতুন সরকার শপথ নেওয়ার দুদিন আগে চন্দ্রনাথ রথ খুন। চন্দ্রনাথের মুখ চিরকাল বন্ধ করতেই কি নৃশংস ঘটনা। কার পাকা ধানে মই দিয়েছিল চন্দ্রনাথ। বিজেপি তৃণমূলকে আর তৃণমূল বিজেপিকে দোষ ঠেলছে। কিন্তু আসল সত্যিটা কি। তা নিয়েই চলছে বিতর্ক।
পুলিশ সূ্ত্রে খবর চন্দ্রনাথ খুনে সাত থেকে আট দুষ্কৃতী জড়িত। তদন্তকারীদের দাবি খুনের আগে হোয়াটস অ্যাপ গ্রুপে কথাবার্তা চালায় দুষ্কৃতীরা। স্থানীয় স্তরে কেউ দুষ্কৃতীদের তথ্য আদান প্রদান করেছে। চন্দ্রনাথ রথ খুনের ঘটনায় ক্লু খুঁজতে উত্তপ্রদেশেও গেছে তদন্তকারী দলের সদস্যরা। চন্দ্রনাথের সঙ্গে গাড়িতে থাকা চালক এখনও হাসপাতালে। তিনি সুস্থ হলে আরও তথ্য় পাওয়া যাবে বলে মনে করা হচ্ছে।