আরপ্লাস নিউজ ডিজিটাল ডেস্ক : একটা ভিডিও সব এলোমেলো করে দিয়েছে। সংখ্যালঘুদের উন্নয়নের কথা বলা হুমায়ুন কবীরের একটা মন্তব্য তাঁকে রাতারাতি যেন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের একাংশের কাছে ভিলেন তৈরি করে দিয়েছে। হুমায়ুন কবীরের হাত ছেডে়ছে জোটসঙ্গী মিম। একাই ১৮২ আসনে লড়াই করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন হুমায়ুন কবীর। এবার কী হবে। ভোটে লড়ার জন্য তাঁর ভরসার জায়গা সংখ্যালঘু ভোট। সেই সংখ্যালঘু ভোট যদি তাঁর কপালে না জোটে তাহলে কী হবে আগামী দিনে হুমায়ুন কবীরের রাজনৈতিক ভবিষ্যত। ১৮২ আসনে যে প্রার্থী দিয়েছে হুমায়ুন কবীরের আম জনতা পার্টি তার কথা নয় হয় বাদই রাখলাম। কিন্তু হুমায়ুন কবীর মুর্শিদাবাদের যে দুটি কেন্দ্রে লড়ছেন নওদা ও বেলডাঙায় কী হবে। আদৌ কি খাতা খুলতে পারবেন তিনি। নাকি ফের হারের ধাক্কা সহ্য করতে হুমায়ুন কবীরকে। যেমনটা ২০১৬ সালে হয়েছিল।

হুমায়ুন কবীর রাজনৈতিক সবঘাটের জল খেয়েছেন। তিনি কংগ্রেস, তৃণমূল কংগ্রেস এবং বিজেপি—তিন দলের টিকিটে লড়েছেন। হুমায়ুন ১৯৮২ সাল থেকে রাজনীতি করছেন মুর্শিদাবাদ জেলাতে। দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে কংগ্রেস করেছেন। অধীর চৌধুরীর ছায়া সঙ্গী বলে পরিচিতও ছিলেন। ২০১১ সালে কংগ্রেসের টিকিটে রেজিনগর থেকে প্রথম বিধায়ক নির্বাচিত হন। কিন্তু অধীরের সঙ্গে দুরত্ব তৈরি হওয়ায় ২০১২ সালে কংগ্রেস ছেড়ে তৃণমূলে যোগদান করেন প্রতিমন্ত্রী হন হুমায়ুন। তবে ছ মাস মন্ত্রী থাকার পর উপনির্বাচনে কংগ্রেস প্রার্থী রবিউল আলম চৌধুরীর কাছে পরাজিত হন। এর পরই তৃণমূল সঙ্গে দুরত্ব তৈরি হয় তাঁর। প্রকাশ্যে তৃণমূল নেতৃত্বের সমালোচনা করায় দল বিরোধী কার্যকলাপের শোকজ করা হয়। এক পর অধীর চৌধুরীর হাত ধরে কংগ্রেস ফিরে আসেন হুমায়ুন। ২০১৮-য় পঞ্চায়েত ভোটে জেলা পরিষদের একটি আসনে লড়াই করতে নামেন। কিন্তু তৃণমূলের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসের কংগ্রেসের হয়ে ভোটপর্বের সময়ই প্রার্থীপদ লড়াই থেকে সরে দাঁড়ান। এর এক মাসের মাথায় কংগ্রেস ছেড়ে দিল্লিতে বিজেপিতে যোগদান করেন কৈলাশ বিজয়বর্গীয় হাত ধরে। ২০১৯ লোকসভা নির্বাচনে মুর্শিদাবাদ লোকসভা কেন্দ্রে বিজেপি হয়ে লড়াই করতে নামেন। কিন্তু তিনি পরাজিত হন। অবশেষে এনআরসি এবং সিএএ-র বিরোধিতা করে বিজেপি ছাড়েন হুমায়ুন। দ্বিতীয় বার তৃণমূলে যোগ দিয়ে ভরতপুর থেকে জিতে বিধায়ক হন হুমায়ুন কবীর। এবার নতুন দল তৈরি করে ভোট ময়দানে অবতীর্ণ। বাংলার ভোট আবহে তিনি সর্বদা সংবাদ শিরনামে। এবার ঠিক ভোটের মুখে তাঁকে নিয়ে করা একটি স্টিং ভিডিও ভাইরাল হতেই বিপাকে পড়েছেন কবীর সাহেব। যদিও হাল ছাড়তে নারাজ তিনি। তাঁর বিরুদ্ধে চক্রান্ত হচ্ছে বলে দাবি করে তাসের ঘরের মতো ভেঙে যাওয়া ঘরকে গুছিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন। দলের পরাজয়ের কথা বাদই রাখলাম যদি নওদা ও বেলডাঙা এই দুই আসনের একটিতেও জিততে না পারেন তাহলে তাঁর রাজনৈতিক কেরিয়ার বড় ধাক্কা খাবে।
নওদা ও বেলডাঙা এই দুই আসনে তৃণমূলের ভোট ব্যাঙ্ক যথেষ্ট শক্ত। তৃণমূলের পরই রয়েছে কংগ্রেস। যদিও বিজেপি শক্তি বাড়িয়েছে এই কেন্দ্রে। নওদাতে গত বিধানসভা ভোটে তৃণমূলের ভোট শতাংশ ৫৮.১৬। এরপরেই রয়েছে বিজেপি ২১.৫২ শতাংশ। কংগ্রেস ১৫.৬২ শতাংশ। । তবে ২৪ শের লোকসভা নির্বাচনে অনেকটাই ভোট বাড়িয়েছে কংগ্রেস। তাঁদের ভোট বেড়ে ৩৩.৭৪ শতাংশ। তৃণমূল ৪৩.৫৪ শতাংশ। অন্যদিকে বেলডাঙায় ২০১১ সালে কংগ্রেসের সফিউজ্জামান শেখ এই আসনটি জিতেছিলেন। আরএসপির মহম্মদ রেফাতুল্লাহকে ১৩,৮৮৩ ভোটে পরাজিত করেছিলেন। ২০১৬ সালে তিনি তৃণমূল কংগ্রেসের গোলাম কিবরিয়া মিয়াকে ৩০,২৮১ ভোটে পরাজিত করে আসনটি ধরে রেখেছিলেন, কিন্তু ২০২১ সালে তৃণমূল কংগ্রেস হাসানুজ্জামান শেখকে প্রার্থী করলে এই আসনটি বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়, বিজেপির সুমিত ঘোষকে ৫৩,৮৩২ ভোটে পরাজিত করেন, সফিউজ্জামান শেখ তৃতীয় স্থান অর্জন করেন। বাবরি মসজিদের শিলান্যাস করে খেলাটা জমিয়ে দিয়েছিলেন হুমায়ুন কবীর কিন্তু তাল কেটেছে ওই স্টিং ভিডিও। যদিও শনিবার বেলডাঙার সভা থেকেও নিজেকে নির্দোষ বলে দাবি করেছেন তিনি। তিনি যখন সাফাই দিতে ব্যস্ত তখন তৃণমূল কংগ্রেসের সেকেন্ড ইন্ড কমান্ড অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় বিজেপির সঙ্গে হুমায়ুন কবীরের আঁতাত নিয়ে ফের প্রশ্ন তুলেছেন।
অন্যদিকে মিমের আগে নওশাদ সিদ্দিকির দলের সঙ্গে জোট করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন হুমায়ুন কবীর। এই নিয়ে অনেক আলোচনাও হয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা আর বাস্তবের মুখ দেখেনি এই জোট। নওশাদ সিদ্দিকিও স্টিং ভিডিও নিয়ে মুখ খুলেছেন। আরামবাগে প্রার্থীর হয়ে প্রচারে গিয়ে তাঁর সাফ কথা, “ওই ভিডিয়োর সত্যতা যদি প্রমাণিত হয়, তবে বাংলার মানুষ কোনওভাবেই এই ধরনের বিশ্বাসঘাতকতাকে ক্ষমা করবে না।” তাঁর মতে, সংখ্যালঘু ভোট নিয়ে যারা দরাদরি করে, তাদের জায়গা বাংলার মাটিতে হবে না।
অতএব স্টিং ভিডিও হুমায়ুন কবীরের অস্বস্তি যে বাড়িয়েছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এখন দেখার হুমায়ুন কবীর কীভাবে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারেন। যদিও নিন্দুকেরা বলছেন হুমায়ুন কবীর আগে থেকেই আভাস বুঝেছিলেন তাই দু দুটি কেন্দ্রে প্রার্থী হয়েছেন। নিজেকে সেফ রাখার জন্য।