সামনেই উৎসবের মরশুম। পুজোর মুখে কি কমতে পারে সোনার দাম? জানি অবাক হচ্ছেন। কেননা সোনার দাম ক্রমশই উর্ধমুখী হচ্ছে। সেই জায়গায় এমন কি ঘটল যাতে এই সম্ভাবনা উঠে আসছে। গত ৪ মাসের মধ্যে দ্বিতীয়বার সোনা না কেনার পরামর্শ দিলেন নরেন্দ্র মোদী।

মে মাসে সোনা, রুপো এবং অন্যান্য মূল্যবান ধাতুর উপর কার্যকর ইমপোর্ট ডিউটি বা আমদানি শুল্ক একলাফে ৬% থেকে বাড়িয়ে ১৫% করেছে কেন্দ্রীয় সরকার। একদিকে সরকার সোনা না কেনার কথা বলছে, অন্যদিকে প্রশ্ন উঠছে সরকার কি আমদানি শুল্ক কমানোর কথা ভাবছে? যদি এইরকম হয় তাহলে উৎসবের আবহে সোনার দাম কমবে? কেন বারবার প্রধানমন্ত্রীর কথায় সোনার প্রসঙ্গ উঠে আসছে? কোন বিষয় নিয়ে চিন্তায় কেন্দ্র?
সুদূর অতীত থেকে সাধারণ মানুষের কাছে সোনা শুধু অলংকার হিসাবেই নয় অর্থ সঞ্চয়ের একটি রাস্তাও। অন্যদিকে ভারত সরকার সোনাকে আমদানি হিসাবে দেখছে।নরেন্দ্রী মোদী ১লা সেপ্টেম্বর ভারতবাসীকে পরামর্শ দিয়েছিলেন প্রয়োজন ছাড়া সোনা না কেনার, বিদেশে বিয়ের অনুষ্ঠান না করার এবং বিদেশ ভ্রমন না করার। একই পরামর্শ ১০ মে তেও দিয়েছিলেন। প্রশ্ন হচ্ছে কেন? ঠিক কি উদ্দেশ্য এর পিছনে ? চলুন গোটা বিষয়টা আপনাদের একটু বুঝিয়ে বলি। ভারতে যে পরিমান সোনার চাহিদা রয়েছে,সেই পরিমান সোনার খনি ও যোগান নেই।সেই কারনে প্রচুর পরিমান সোনা আমাদের বাইরে থেকে কিনতে হয়। বাইরে থেকে সোনা কেনার জন্য প্রয়োজন ফরেন কারেন্সি।যার বড় অংশ ডলারে দেওয়া হয়।একই বিষয় ফরেন ট্যুরের ক্ষেত্রেও। আপনি দেশের যেকোনও জায়গায় যান সেখানে খাবার খান ,হোটেলে থাকুন বা যাই খরচা করুন অর্থ ভারতের অর্থনীতির মধ্যেই থাকে।তবে বিদেশ ভ্রমনের ক্ষেত্রে একই খরচ একাংশ চলে যায় ফরেন এক্সচেঞ্জে।ঠিক এই জায়গাতেই চিন্তিত কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রক।
ভারতকে বিদেশ থেকে মূলত অপরিশোধিত তেল ও গ্যাস,যন্ত্রপাতি ও প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম,রাসায়নিক ও সারের মত বিশাল অংকের নিত্য়প্রয়োজনীয় জিনিস বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়।তার ওপর পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ পরিস্থিতির জেরে অপরিশোধিত তেল ও গ্যাসের মত একাধিক দৈনন্দিন জিনিস আমদানি করতে বেশ বেগ পেতে হচ্ছে দেশকে।এই পরিস্থিতিতে সরকার চাইছে যদি কোনওভাবে বিদেশি জিনিসের আমদানি কমিয়ে বিদেশি মুদ্রার খরচ কমানো যায়।যদি তা না করা যায় টাকার দাম পড়ে যায়, ফলে দেশকে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির মুখে পড়তে হবে।আর এই আমদানিকৃত সামগ্রির মধ্যে সোনার আমদানি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।কারন বিপুল পরিমান সোনার আমদানি। সংবাদমাধ্যমের তথ্য়ানুযায়ী,
এপ্রিল ও জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময়ে ভারতের আমদানিকৃল সোনা ডলারের হিসাবে গত বছরের তুলনায় ৩২.৪% বেড়ে ১৪.২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছে গেছে। সোনার দাম ক্রমাগত বৃদ্ধি পাওয়ায় আমাদানির খরচও বেড়ে যাচ্ছে।যার ফলে দেশবাসী বেশি দামের কারনে সোনা কেনা কমিয়ে দিয়েছে।দামের দিকে নজর রেখে সোনার দোকানগুলিও কম ওজনের গয়না বানানো শুরু করে দিয়েছে।সাধারণ মানুষও পছন্দের সোনার ডিজানই কম ওজনের বা কম ক্যারেটের বানানোর দিকে নজর দিচ্ছে। ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের রিপোর্ট অনুযায়ী, এপ্রিল-জুন মাসের মধ্যে ভারতে সোনার গয়নার চাহিদা প্রায় ১৫% হ্রাস পেয়েছে। এই সময়ে গয়নার মোট চাহিদা আগের বছরের ৮৮.৮ টন থেকে কমে ৭৫.১ টনে নেমে এসেছে। তবে এই জুয়েলারির খরচ ৩৪ % বেড়ে প্রায় ১.১৩ লক্ষ কোটি টাকা হয়ে গেছে।
আরও একটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হল পুরনো গয়নার বদলে নতুন গয়না কেনার হিড়িক। আগে হলে পুরোন গয়না রেখে আরও একটি নতুন গয়না কেনা হত। তবে সোনার দাম বেড়ে যাওয়ায় এক্সচেঞ্জের ওপর বেশি ঝোঁক বেড়েছে। অর্থাৎ সোনার দাম বাড়লেও সোনা কেনার প্রবনতা না কমিয়ে নয়া পন্থা বেঁছে নিয়েছে দেশের সোনাপ্রেমী মানুষ।
এখন ঘরে পড়ে থাকা সোনাও মানুষের অনেক উপকারে আসছে। আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দাম ক্রমাগত বৃদ্ধি পাওয়ায়, গ্রাহকদের গচ্ছিত সোনার মূল্যায়ন বাড়ছে। ফলে অতিরিক্ত সোনা জমা না দিয়েই গ্রাহকরা বেশি অঙ্কের ঋণ পাচ্ছেন। পার্সোনাল লোন বা অন্যান্য ঋণের তুলনায় গোল্ড লোন পাওয়া অনেক বেশি সহজ। কোনো আয়ের প্রমাণ ছাড়াই ডিজিটাল ব্যবস্থার মাধ্যমে দ্রুত এই ঋণ বিতরণ করা হচ্ছে।ভারতে হোম লোনের (গৃহ ঋণ) পরেই গোল্ড লোন এখন দ্বিতীয় বৃহত্তম খুচরো ঋণ বিভাগে পরিণত হয়েছে এবং এটি পার্সোনাল লোনকেও পেছনে ফেলে দিয়েছে। আরও একটি ভাল খবর। ভারতের সংগঠিত গোল্ড লোন বাজার ২০২৬ থেকে ২০২৮ সালের মধ্যে এক বিশাল বৃদ্ধির সম্মুখীন হতে চলেছে। বিভিন্ন রেটিং এজেন্সি ও আর্থিক গবেষণা সংস্থার সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের গোল্ড লোন মার্কেট ২০২৬ সালের মার্চের ১৮.৬ লক্ষ কোটি টাকা থেকে ২৮% চক্রবৃদ্ধি হারে বৃদ্ধি পেয়ে ২০২৮ সালের মার্চের মধ্যে ৩০ লক্ষ কোটি টাকার গণ্ডি অতিক্রম করবে।
এককথায় সরকার সাধারণ মানুষের সোনা কেনা বেআইনি বা নিষিদ্ধ ঘোষণা করেনি। এটি মূলত দেশের অর্থনৈতিক স্থায়িত্ব রক্ষার স্বার্থে একটি স্বেচ্ছা আবেদন।দেশের ফরেক্স রিজার্ভ বা বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডার সুরক্ষিত রাখতে এই আহ্বান জানানো হয়েছে।রেকর্ড পরিমাণ সোনা আমদানির কারণে দেশের অর্থনীতিতে যে বাড়তি আমদানি বিলের চাপ সৃষ্টি হচ্ছে, তা কমানোই এর মূল লক্ষ্য।