শ্রেয়সী বল, সাংবাদিক : ২০২৬ সালের বিশ্ব সংবাদপত্রের স্বাধীনতা সূচকে ১৮০টি দেশের মধ্যে ভারতের স্থান ১৫৭। রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস এর প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, আগের বছরের তুলনায় ভারতের ছয় ধাপ অবনতি হয়েছে, যা দেশে স্বাধীন সাংবাদিকতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং সাংবাদিকদের নিরাপত্তার ওপর ক্রমবর্ধমান চাপকে নির্দেশ করে।গণমাধ্যমের স্বাধীনতার নিরিখে শীর্ষ ১০টি দেশ হলো:১. নরওয়ে২. এস্তোনিয়া৩. নেদারল্যান্ডস৪. ডেনমার্ক৫. সুইডেন৬. সুইজারল্যান্ড৭. ফিনল্যান্ড৮. আয়ারল্যান্ড৯. জার্মানি১০. লাটভিয়া।সেই জায়গায় ভারতের অবস্থান পাকিস্তান ও বাংলাদেশরও পরে।

একদিকে সাম্প্রদায়িক ইস্যু যেন কিছুতেই পিছু ছাড়ছেনা মোদি সরকারের। বর্তমানে রাজ্যে পালাবদল হয়েছে। এর আগে বহুবার চেষ্টা করেও বঙ্গভূমে পদ্ম ফোঁটানোয় মুল বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছে সাম্প্রদায়িক বিভাজনের তত্ত্ব।এবার দেশের গন্ডি পেড়িয়ে বিদেশের মাটিতেও সেই একই বিতর্কে মুখে পড়তে হল দেশের প্রশাসনিক প্রধানকে। যার সঙ্গে যুক্ত হল সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতাও।যদিও সেই বিতর্কের মুখে ঝামা ঘষে দিয়েছে নয়াদিল্লি।
ভারতের গণতন্ত্র, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং সংখ্যালঘু অধিকার নিয়ে নেদারল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী রব জেটেনের করা মন্তব্যকে দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান ও কড়া প্রতিবাদ জানিয়েছে নয়াদিল্লি।ভারতের পক্ষ থেকে সাফ জানানো হয়েছে, এই ধরণের প্রশ্ন ও মন্তব্য ভারতের ইতিহাস, বিশাল বৈচিত্র্য এবং এখানকার গণতন্ত্র সম্পর্কে “বোঝার অভাব” থেকে উঠে এসেছে।প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নেদারল্যান্ডস সফরের সময় এই প্রসঙ্গ ওঠে, আর সেখানেই ভারতের তরফে স্পষ্ট জানানো হয়, ভারত এক প্রাণবন্ত গণতন্ত্র, যেখানে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও সংখ্যালঘুদের অধিকার সম্পূর্ণভাবে সুরক্ষিত।ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠকের আগে স্থানীয় সাংবাদিকদের কাছে এই উদ্বেগের কথা তুলে ধরেন তিনি। তবে ভারতীয় সূত্রের দাবি, দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে এসব বিষয় নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি।মোদির দুই দিনের নেদারল্যান্ডস সফরে দুই নেতা একাধিক বৈঠক ও কর্মসূচিতে অংশ নেন। সফরে দুই দেশের সম্পর্ককে কৌশলগত অংশীদারত্বে উন্নীত করার ঘোষণা করা হয়।
নিজের সরকারি বাসভবন ক্যাটশুইসে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন জেটেন। নেদারল্যান্ডসের সংবাদমাধ্যম সূত্রে খবর, মোদির সফরের আগেই তার হিন্দুত্ববাদী বিজেপি সরকারের আমলে ভারতে ঘটে যাওয়া ঘটনা নিয়ে নেদারল্যান্ডস ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্যদেশগুলোর মধ্যে উদ্বেগে রয়েছেন নেদারল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী।
তাঁর মতে,বিষয়টি শুধু সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নয়, সংখ্যালঘুদের অধিকার নিয়েও। বিশেষ করে মুসলিম সম্প্রদায় তীব্র চাপের মধ্যে রয়েছে। আরও অনেক ছোট ছোট সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য।জেটেন বলেন, এসব উদ্বেগ ভারত সরকারের কাছে নিয়মিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ভারতের মধ্যে সম্ভাব্য মুক্ত বাণিজ্যচুক্তি শুধু বাণিজ্য নয়, মানবাধিকার, গণতন্ত্র ও আইনের শাসনের মতো বিষয়েও আলোচনার সুযোগ তৈরি করবে বলে তিনি মনে করেন।
বৈঠকের পর এক্সে দেওয়া পোস্টে জেটেন সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা বা সংখ্যালঘু অধিকার নিয়ে কিছু বলেননি। তিনি পোস্টে লেখেন, মোদির সঙ্গে আলোচনায় হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকা, জ্বালানির দাম ও ইনসিয়া হেমানির বিষয়টি উঠে এসেছে। নৈশভোজ শেষে ভারতীয় কর্মকর্তারা একটি বিশেষ সাংবাদিক সম্মেলনে অংশ নেন। ভারতীয় বিদেশ মন্ত্রকের প্রেস ব্রিফিং চলাকালীন নরওয়ের সাংবাদিক হিলি লিং বারবার ভারতের মানবাধিকার ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। ওই সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে বিন্দুমাত্র ব্যাকফুটে না গিয়ে ভারতের বিদেশ মন্ত্রকের সচিব সিবি জর্জ ভারতের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার পক্ষে তীব্র সওয়াল করেন। তিনি স্পষ্ট জানান, ভারতের বিশালত্ব এবং জটিলতা না বুঝেই কিছু স্বঘোষিত এনজিও-র এজেন্ডাভিত্তিক রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে পশ্চিমী দুনিয়া ভারত সম্পর্কে মতামত তৈরি করে। সিবি জর্জ বলেন, “আপনারা কি জানেন ভারতে কত খবর তৈরি হয়? আমাদের এখানে প্রতিদিন সন্ধ্যায় ব্রেকিং নিউজের বন্যা বয়ে যায়। শুধুমাত্র দিল্লিতেই ইংরেজি, হিন্দি এবং একাধিক আঞ্চলিক ভাষায় অন্তত ২০০টি টিভি চ্যানেল রয়েছে। ভারতের পরিধি ও বৈচিত্র্য সম্পর্কে এদের কোনও ধারণাই নেই। এরা কিছু নামগোত্রহীন, অজ্ঞ এনজিও-র লেখা দু-একটি রিপোর্ট পড়ে চলে আসেন এবং এখানে এসে প্রশ্ন তোলেন!”
ভারতের সংবিধানে সকলের মৌলিক অধিকার কীভাবে সুরক্ষিত, তা ওই সাংবাদিককে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেন বিদেশ মন্ত্রকের এই শীর্ষ আধিকারিক। তিনি বিশেষভাবে মনে করিয়ে দেন, স্বাধীনতার ঠিক পরেই, ১৯৪৭ সালেই ভারত তার দেশের সমস্ত নারীকে ভোটাধিকার দিয়েছিল। অথচ বিশ্বের বহু উন্নত দেশ, যারা আজ মানবাধিকারের পক্ষে সওয়াল করে, তারা ভারতের বহু দশক পরে নারীদের ভোটাধিকার দিয়েছিল। সিবি জর্জের সাফ কথা, “জনগণের অধিকার এবং নারীদের সমান অধিকারের বিষয়ে আমাদের সংবিধান গ্যারান্টি দেয়। আর মানবাধিকারের সবচেয়ে বড় উদাহরণ কী? নিজের ভোট দিয়ে সরকার পরিবর্তন করার ক্ষমতা। ভারতে সেটাই প্রতিনিয়ত হচ্ছে এবং আমরা তা নিয়ে অত্যন্ত গর্বিত।”
তবে এই বিতর্কের সূত্রপাত হয়েছিল নরওয়ের এক সাংবাদিক হিলি লিং সমাজমাধ্যমে পোস্ট করে অভিযোগ করেছিলেন, নরওয়ে সফরে এসে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী তাঁর প্রশ্নের উত্তর দেননি। পাশাপাশি সাংবাদিকের প্রশ্নে উত্তর না দিয়ে মঞ্চ ছেড়ে চলে গিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী।বিশ্বের ‘প্রেস ফ্রিডম ইনডেক্স’-এর তুলনা টেনে ভারতের সমালোচনাও করেন তিনি।তার জবাবে নরওয়েতে অবস্থিত ভারতীয় দূতাবাস অত্যন্ত ভদ্রভাবে এক্স হ্যান্ডেলেই তাঁকে আমন্ত্রণ জানিয়ে লেখে, “প্রিয় হিলি, প্রধানমন্ত্রীর সফর নিয়ে আমাদের অফিসিয়াল প্রেস ব্রিফিং রয়েছে। আপনি আমন্ত্রিত, সেখানে এসে আপনার যত প্রশ্ন আছে করতে পারেন।” কিন্তু সৌজন্যের জবাবে সাংবাদিক বৈঠকে কার্যত ঔদ্ধত্য দেখালেন ওই নরওয়েজিয়ান সাংবাদিক। পরে নিজের আচরণের সাফাই দিয়ে তিনি লেখেন, “সাংবাদিকতা কখনও কখনও মুখোমুখি সংঘাতের রূপ নেয়। আমি শুধু উত্তর চেয়েছিলাম।”
২০১৭ সালের পর এই প্রথম নেদারল্যান্ডস গেলেন তিনি।প্রধানমন্ত্রীর ইউরোপ সফরের মধ্যেই বিদেশের মাটিতে এই বেনজির সাংবাদিক বৈঠক এবং দিল্লির কড়া অবস্থান নিয়ে এখন আন্তর্জাতিক মহলে জোর চর্চা চলছে।