বিশ্বজিৎ নস্কর, নিজস্ব সংবাদদাতা : ভোট মিটতেই ফলতায় অশান্তির আগুন, হাশিমনগরে বিজেপির বিক্ষোভে জাতীয় সড়ক অবরোধ পুনর্নির্বাচনের দাবিতে সরব বিরোধী শিবির।
দ্বিতীয় দফার ভোটগ্রহণ শেষ হতেই ফের উত্তপ্ত হয়ে উঠল দক্ষিণ ২৪ পরগনার ফলতা বিধানসভা কেন্দ্র। ভোট-পরবর্তী অশান্তির জেরে শুক্রবার হাশিমনগর এলাকায় চরম উত্তেজনা ছড়ায়। বিজেপি কর্মী-সমর্থকদের উপর হামলার অভিযোগকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতি দ্রুত জটিল আকার নেয়। অভিযোগের তির তৃণমূলের স্থানীয় নেতৃত্বের দিকে। ঘটনার প্রতিবাদে বিজেপি কর্মীরা ১১৭ নম্বর জাতীয় সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভে সামিল হন, যার জেরে দীর্ঘক্ষণ যান চলাচল ব্যাহত হয়।

স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, ভোটের দিন থেকেই হাশিমনগর-সহ একাধিক এলাকায় উত্তেজনার পরিবেশ তৈরি হয়েছিল। বিজেপির দাবি, তাদের বহু কর্মী ও সমর্থককে ভোট দিতে বাধা দেওয়া হয়। এমনকি বুথে ঢুকতেও দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ। এই ঘটনার প্রতিবাদ করতেই ভোট শেষের পর এলাকায় বিক্ষোভ শুরু হয়। অভিযোগ, সেই সময় তৃণমূলের এক পঞ্চায়েত প্রধানের নেতৃত্বে কিছু দুষ্কৃতী বিজেপি কর্মীদের উপর চড়াও হয় এবং ব্যাপক মারধর করা হয়। একাধিক কর্মী আহত হয়েছেন বলেও দাবি বিজেপির।
এই ঘটনার জেরে ক্ষুব্ধ বিজেপি সমর্থকরা হাশিমনগর এলাকায় ১১৭ নম্বর জাতীয় সড়ক অবরোধ করেন। রাস্তায় টায়ার জ্বালিয়ে এবং ব্যারিকেড ফেলে তারা বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করেন। পরিস্থিতি ক্রমশ উত্তপ্ত হতে থাকায় এলাকায় চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়ে। খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছয় ফলতা থানার পুলিশ এবং কেন্দ্রীয় বাহিনী। বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে কথা বলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করা হয়।
এদিকে, ঘটনার খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন বিজেপি প্রার্থী দেবাংশু পণ্ডা। তিনি আহত কর্মীদের সঙ্গে কথা বলেন এবং প্রশাসনের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। দেবাংশুর অভিযোগ, পরিকল্পিতভাবে বিজেপি কর্মীদের ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে এবং ভোট পরবর্তী সন্ত্রাস চালানো হচ্ছে। তিনি স্পষ্ট জানান, এই পরিস্থিতিতে অবাধ ও সুষ্ঠু ভোট সম্ভব হয়নি। তাই পুনর্নির্বাচনের দাবি তোলেন তিনি।
অন্যদিকে, কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন তৃণমূল প্রার্থী জাহাঙ্গির খান। তিনি বিজেপির সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “এই অশান্তির সঙ্গে তৃণমূলের কোনও সম্পর্ক নেই। বিজেপি ইচ্ছাকৃতভাবে পরিস্থিতি উত্তপ্ত করার চেষ্টা করছে।” তৃণমূলের অঞ্চল সভাপতি ইসরাফিল সর্দারও একই সুরে দাবি করেন, বিজেপি ভিত্তিহীন অভিযোগ তুলে রাজনৈতিক ফায়দা লোটার চেষ্টা করছে।

পরিস্থিতি আরও স্পর্শকাতর হয়ে ওঠায় ঘটনাস্থলে হাজির হন ডায়মন্ড হারবার পুলিশ জেলার বিশেষ পর্যবেক্ষক আইপিএস অজয়পাল শর্মা। তিনি সরেজমিনে পরিস্থিতি খতিয়ে দেখেন এবং পুলিশ প্রশাসনকে প্রয়োজনীয় নির্দেশ দেন। তাঁর উপস্থিতিতে প্রশাসন আরও সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে পরিস্থিতি শান্ত করার উদ্যোগ নেয়।
প্রশাসনের তরফে বিক্ষোভকারীদের নিরাপত্তার আশ্বাস দেওয়া হয়। তাঁদের অভিযোগ খতিয়ে দেখা হবে বলেও জানানো হয়। এরপর ধীরে ধীরে বিক্ষোভকারীরা অবরোধ তুলে নেন। যান চলাচল স্বাভাবিক হতে শুরু করে এবং এলাকায় আপাতত শান্তি ফিরে আসে।
উল্লেখযোগ্যভাবে, দ্বিতীয় দফার ভোটের শুরু থেকেই ফলতা বিধানসভা কেন্দ্র উত্তপ্ত ছিল। বিভিন্ন বুথে বিক্ষিপ্ত অশান্তি, ইভিএম বিভ্রাট এবং ভোটারদের বাধা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এমনকি পুলিশ পর্যবেক্ষক ও তৃণমূল প্রার্থীর মধ্যে ‘ঠান্ডা যুদ্ধ’-এর অভিযোগও সামনে এসেছে, যা রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের দফতর সূত্রে জানা গিয়েছে, মোট ৭৭টি বুথে পুনর্নির্বাচনের আবেদন জমা পড়েছে, যার মধ্যে ফলতা বিধানসভা কেন্দ্রেই রয়েছে ৩২টি বুথ। ফলে এই কেন্দ্রকে ঘিরে রাজনৈতিক উত্তাপ যে আরও বাড়তে পারে, তা বলাই বাহুল্য। উল্লেখ্য, ফলতা, ডায়মন্ড হারবার এবং বজবজ — এই তিনটি বিধানসভা কেন্দ্রই অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের লোকসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত, ফলে এই অঞ্চলের রাজনৈতিক গুরুত্বও যথেষ্ট বেশি।
সব মিলিয়ে, ভোট মিটলেও ফলতায় অশান্তির আবহ কাটেনি। তবে শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত প্রশাসনের তৎপরতায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এসেছে। যদিও রাজনৈতিক চাপানউতোর এখনও জারি রয়েছে, আর পুনর্নির্বাচনের দাবি ঘিরে আগামী দিনে পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, সেদিকেই নজর রাজনৈতিক মহলের।