জুলেখা নাসরিন, সাংবাদিক: নেদারল্যান্ডসের আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত- আইসিসি-তে মামলার আবেদন করেছেন একজন ব্রিটিশ আইনজীবী। সেই মামলার বিষয়বস্তু কি জানেন। মামলার বিষয়বস্তু হচ্ছে, বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের হত্যা, নির্বিচারে গ্রেপ্তারসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ। লন্ডনের ডাউটি স্ট্রিট চেম্বার্সের আইনজীবী স্টিভেন পাওলস কেসি আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে এই মামলা করেছেন। হাসিনার পতন হয় বাংলাদেশে ৫ অগাস্ট বা বলা যেতে পারে তিনি পদত্যাগ করেন ৫ অগাস্ট। ৮ অগাস্ট দায়িত্ব নেন ইউনুস। একেবারে মানব দরদী হিসাবে। আর তারপর থেকে মাঝে কেটে গিয়েছে ১৫টি মাস। এই ১৫ মাসে পদ্মা দিয়ে অনেক জল গড়িয়েছে। ইউনুসের ১৫ মাসের শাসনকালে খুন হয়েছেন কয়েক হাজার আওয়ামী লীগ কর্মী। কারও মৃত্যু হয়েছে জেলের অন্ধকার গারদে। কারও আবার মৃত্যু হয়েছে অত্যাচারে। কাউকে নৃশংসভাবে খুন করা হয়েছে। আহত হয়েছেন প্রায় ১৫ হাজার আওয়ামী লীগ কর্মী। অনেকে যারা এখনও আওয়ামী লীগ করেন তারা হয় ভয়ে ভয়ে এই প্রাচীন দলকে সমর্থন করেন না হয় লুকিয়ে থেকে সমর্থন করেন। অনেক আওয়ামী লীগ সমর্থক আবার দেশ ছেড়ে পালিয়েও গিয়েছেন। ফলে সব মিলিয়ে ইউনুসের বাংলাদেশে একটা ঘোর বিপর্যয়ের মধ্যে দিয়ে দিন কাটাতে হচ্ছে আওয়ামী লীগ সমর্থকদের। কিন্তু দলনেত্রী সর্বদা তাঁদের পাশে থেকে নানা ভাবে দলের সমর্থকদের উজ্জীবিত করে গিয়েছে।

কিন্তু কত সময় বলুন তো এক তরফা ভাবে অত্যাচার সহ্য করা যায়। দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে কামড়াতে না পারি ফোস তো করতে হবে তাই না। আর সেটাই এবার করল আওয়ামী লীগ। অর্থাৎ মারের পাল্টা মার। চালের পাল্টা চাল। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত বা আইসিসি-তে ইউনুসের বিরুদ্ধে মামলা করল আওয়ামী লীগ। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের রোম সংবিধান অনুযায়ী এই মামলা দায়ের করা হয়েছে। মামলা দায়ের হয়েছে ইউনুস ও তাঁর সরকারের বিরুদ্ধে। আইসিসি-র প্রসিকিউটরের কাছে রোম সংবিধানের ১৫ নং বিধি অনুযায়ী এই মামলা দাখিল করা হয়েছে। এবং অনুরোধ করা হয়েছে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী ও হাসিনা সরকারের সঙ্গে যারা যুক্ত ছিল সেই সমস্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ওঠা প্রতিশোধমূলক হিংসাত্মক ঘটনার যেন তদন্ত করা হয়। কারণ আওয়ামী লীগ মনে করছে, আইসিসি-তে নথিভুক্ত আওয়ামী লীগ সমর্থকদের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ তোলা হয়েছে তা মানবতাবিরোধী অপরাধের পর্যায়ে পড়ে।
এখানেই কিন্তু কিস্তিমাত বলতে হবে আওয়ামী লীগের। কারণ কি…. কারণ হচ্ছে, হাসিনার বিরুদ্ধে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা রায়ের অপেক্ষায় । ১৩ নভেম্বর ঢাকার আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত হাসিনা এবং প্রাক্তন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের বিচারের রায় ঘোষণা করবেন। ২০২৪ সালের জুলাই-অগাস্ট আন্দোলনের সময়ে, আন্দোলন দমনে ১৪০০ জনকে হত্যার উসকানি। প্ররোচনা ও নির্দেশ দান। সুপিরিয়র কমান্ড রেসপনসেবলিটি এবং জয়েন্ট ক্রিমিনাল এন্টারপ্রাইজের মোট পাঁচ অভিযোগে শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ড চাওয়া হয়েছে ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশনে। আর ঠিক তখনই আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে আইসিসিতে অভিযোগ দায়ের ইউনুস ও তাঁর সরকারের বিরুদ্ধে। কি বুঝলেন খেলা ঘুরছে তো বাংলাদেশে। বলেছিলাম না, হাসিনা পোড় খাওয়া রাজনীতিবিদ। ছাইচাপা আগুনকে দাবানলে রূপ দিতে পারেন তিনি। হাত গুটিয়ে তিনি যে বসে নেই সেটা আরও একবার স্পষ্ট। আরও একটা বিষয় ভুললে চলবে না বাংলাদেশে নির্বাচন কিন্তু আসন্ন। আর বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন ইতিমধ্যে বলেছে আওয়ামী লীগ নির্বাচনে লড়াই করতে পারবে না। ফলে দীর্ঘদিন মসনদে থাকা হাসিনা যে ছেডে় কথা বলবেন না সেটা একপ্রকার স্পষ্ট ছিল।
২০২৪-এর ৫ অগাস্ট গণ-অভ্যুস্থানে ক্ষমতা হারিয়ে বর্তমানে ভারতের রাজনৈতিক আশ্রয়ে রয়েছেন হাসিনা। আর সেখান থেকেই ক্রমাগত তিনি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন ইউনুসের বিরুদ্ধে। শুধু দেশে নয় বিদেশেও সমানে প্রচার করছেন ইউনুসের অপকীর্তি। ছায়া প্রশাসন চালাচ্ছেন আওায়মী লীগ নেত্রী। এবার বলি,আইসিসি-তে কি অভিযোগ করেছে আওয়ামী লীগ। আইনজীবী স্টিভেন পাওলস কেসি-র দাখিল করা আবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে, ২০২৪ সালের জুলাই থেকে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের প্রায় ৪০০ জন নেতাকর্মীকে হত্যা করা হয়েছে। যাদের অনেককে মব তৈরি করে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। একেবারে সেই ঘটনার প্রমাণ হিসাবে ভিডিও তুলে দেওয়া হয়েছে আইসিসি-তে। এছাড়া আওয়ামী লীগের সঙ্গে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে যুক্ত ব্যক্তিদের অযৌক্তিকভাবে গ্রেফতার করে জামিন বা অভিযোগ ছাড়াই কারাগারে পাঠানোর অভিযোগও আইসিসি-তে করেছে আওয়ামী লীগ।
রাজনীতিক, বিচারক, আইনজীবী, সাংবাদিক থেকে শুরু করে অভিনেতা ও সংগীতশিল্পীর মত সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ ইউনুস সরকারের সময়ে নিপীড়নের শিকার হচ্ছেন।
২০২৪ সালের জুলাইয়ের পর থেকে কারাগারে অন্তত ২৫ জন আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীর মৃত্যু হয়েছে। এবং তাদের মৃত্যর কারণ বলা হয়েছে হৃদরোগ। কিন্তু তাদের অনেকের শরীরে নির্যাতনের স্পষ্ট চিহ্ন’পাওয়া গেছে। সেটাও অভিযোগে উল্লেখ করেছে আওয়ামী লীগ। কিন্তু শুধু জেলে বা গরাদে থেকে একসঙ্গে এত জনের কী ভাবে হৃদরোগ হল। আচ্ছা আমি ধরেই নিলাম তারা হৃদরোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন। কিন্তু জেলে কি কোনও ডাক্তার ছিলেন না। যদি কোনও আসামী জেলে অসুস্থ হয়ে পড়বেন তারা ওই ভাবেই মারা যাবেন। এটাই কি ইউনুসের বাংলাদেশের রীতী। আরও একটা বিষয় খেয়াল করুন, যে ২৫ জনের হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার কথা বলা হচ্ছে, তারা প্রত্যেকেই আওয়ামী লীগ কর্মী। তাহলে এটা তো স্পষ্ট আওয়ামী লীগ কর্মীদের বেছে বেছে ডাক্তার দেখানো হয়নি। কিংবা ইচ্ছা করে তাদের মারার চক্রান্ত করেছিল ইউনুস সরকার। তাহলে তাদের গায়ে আঘাতের চিহ্ন আসল কোথা থেকে। ইউনুসের বাংলাদেশে, কারাগারে ডাক্তারের পাশাপাশি সিসি ক্যামেরাও রাখা বারন।
নালিশ করে আওয়ামী লীগ বলেছে,বাংলাদেশে প্রকৃতপক্ষে এই সমস্ত অপরাধের তদন্ত বা বিচার হওয়ার কোনো বাস্তব সম্ভাবনা নেই। অপরাধীদের দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে। একটু আপনাদের জানিয়ে রাখি, হাসিনা যখন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন সেই সময়ে আইসিসি রোম সংবিধান স্বাক্ষরিত হয়েছিল। ২০১০ সালের ২৩ মার্চ রোম সংবিধিতে সমর্থন করে বাংলাদেশ। আর ২০১০ সালেরই ১ জুন থেকে তা বাংলাদেশে কার্যকর হয়।
বাংলাদেশে এই চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশে ডেভিল হান্ট নামে যে অপারেশন হয়েছিল তাঁর কথা মনে আছে। যার মূল উদ্দেশ্য ও ঘোষিত লক্ষ্য ছিল আওয়ামী ফ্যাসিবাদ দমন। অন্তব্রতী সরকারের উদ্যোগে পরিচালিত এই অভিযানে ১২ দিনে প্রায় ১৮ হাজার মানুষকে গ্রেফতার করা হয়। পুলিশ ও সেনাবাহিনীর যৌথ উদ্যোগে এই গ্রেফতার করা হয়েছিল।

অপারেশন সার্চলাইটেও তো ১৯৭১ সালে ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তান সেনা একটি পরিকল্পিত গণহত্যা চালিয়েছিল বাংলাদেশে। বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে দমন করতে চেয়েছিল পাকিস্তান। এবং এর উদ্দেশ্য ছিল বিশিষ্ট বাঙালি রাজনীতিবিদ, ছাত্রনেতা ও বুদ্ধিজীবীদের গ্রেফতার করে হত্যা করা। আর এই অভিযানের ফলে ঢাকা শহরে ব্যাপক হত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞ হয়। যা ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সূচনা করে।
আইসিসি-তে জমা দেওয়া আবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ১৪ অক্টোবর অন্তর্বর্তী সরকার একটি ইমিউনিটি অর্ডার জারি করে বাংলাদেশে। যে অর্ডারে যাতে বলা হয়েছিল—১৫ জুলাই থেকে ৮ অগাস্টের মধ্যে আন্দোলনে যারা ভূমিকা রেখেছে, তাদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা, গ্রেপ্তার বা হয়রানি করা হবে না। ফলে এই ধরনের একতরফা দায়মুক্তি শুধু অপরাধীদের নতুন করে অপরাধের সুযোগ করে দিচ্ছে তাই নয়। বরং আওয়ামী লীগের উপর হামলার রাষ্ট্রের নীরব সমর্থনেরও ইঙ্গিত। ফলে হাসিনা মনে করেছেন অনেক হয়েছে আর নয়। এবার রাশ ধরার সময় হয়েছে। তাই লড়াই হবে সম্মুখ-সমরে।