বিশ্বজিৎ নস্কর, নিজস্ব সংবাদদাতা : দিনের আলোয় এখানে ভক্তদের ভিড়, মায়ের আরাধনায় মুখর মন্দির চত্বর। কিন্তু রাত গভীর হতেই বদলে যায় ছবিটা। শ্মশানের নিস্তব্ধতা, ১০৮টি নরমুণ্ডের রহস্যময় উপস্থিতি, আর মধ্যরাতে শেয়ালদের জন্য বিশেষ ভোগ নিবেদনের প্রাচীন রীতি। শুধু কালীপুজো নয়, এই মন্দিরকে ঘিরে জড়িয়ে রয়েছে তন্ত্রসাধনা, শবসাধনা আর বহু অজানা কাহিনি। দক্ষিণ ২৪ পরগনার দক্ষিণ বিষ্ণুপুরের মা করুণাময়ীর মন্দিরে আজও বেঁচে রয়েছে শতাব্দীপ্রাচীন সেই ঐতিহ্য। কিন্তু কী ইতিহাস এই মন্দিরের? কেনই বা দেবীর পিছনে সাজানো রয়েছে ১০৮টি নরমুণ্ড?

দক্ষিণ ২৪ পরগনার মন্দিরবাজার ব্লকের দক্ষিণ বিষ্ণুপুর। আদিগঙ্গার প্রাচীন অববাহিকার কাছেই অবস্থিত এই ঐতিহাসিক শ্মশান ও মা করুণাময়ীর মন্দির। কথিত আছে, শতাধিক বছর আগে এই এলাকা ছিল ঘন জঙ্গলে ঘেরা, প্রায় জনমানবহীন। নির্জন শ্মশান আর আদিগঙ্গার তীরকে কেন্দ্র করেই একসময় গড়ে উঠেছিল তন্ত্রসাধনার ক্ষেত্র।
এই মন্দিরের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে তান্ত্রিক সাধক মণিলাল চক্রবর্তীর নাম। কথিত আছে, ব্রাহ্মণ যুবক মণিলাল তন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে এই নির্জন শ্মশান ও অরণ্যে সাধনা শুরু করেন। সেই সময়ই দেবী করুণাময়ীর স্বপ্নাদেশ পান তিনি। এরপর প্রথমে টালির চালের নীচে শুরু হয় দেবীর পুজো। পরে দেবীর নিত্যপূজার ইচ্ছা প্রকাশের কাহিনি ঘিরে প্রতিষ্ঠিত হয় স্থায়ী মন্দির এবং পঞ্চমুণ্ডির আসন।
এই মন্দিরের সবচেয়ে চমকপ্রদ বৈশিষ্ট্য লুকিয়ে রয়েছে গর্ভগৃহের ভিতরে। দেবী করুণাময়ীর প্রতিমার ঠিক পিছনে সযত্নে সাজানো রয়েছে ১০৮টি আসল নরমুণ্ড। পাশাপাশি রয়েছে তন্ত্রসাধনার জন্য তৈরি পঞ্চমুণ্ডির আসন। তন্ত্রশাস্ত্রে ১০৮টি নরমুণ্ডের উপস্থিতিকে বিশেষ শক্তিশালী সাধনার সঙ্গে যুক্ত বলে মনে করা হয়। আর সেই কারণেই এই মন্দিরকে ঘিরে রয়েছে নানা রহস্য ও লোকবিশ্বাস। তবে আরও একটি বিষয়ে এই মন্দিরের পুজো একেবারে ব্যতিক্রমী। তন্ত্রমতে পুজো হলেও এখানে পশুবলি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। বৈষ্ণব ও তান্ত্রিক রীতির এক অদ্ভুত সমন্বয়ে চলে দেবীর আরাধনা। কালীপুজোর বিশেষ রাতে মা করুণাময়ীর পাশাপাশি উপদেবতা এবং ডাকিনী-যোগিনীদের উদ্দেশে মদ, কাঁচা মাংস, ছোলা-সহ বিভিন্ন উপাচার নিবেদনের রীতি রয়েছে বলে প্রচলিত।
আর এখানেই শেষ নয়। পুজো শেষে গভীর রাতে শ্মশানের শেয়ালদের উদ্দেশে নিবেদন করা হয় বিশেষ শিয়াল ভোগ। স্থানীয় ঐতিহ্য অনুযায়ী, এই রীতি আজও পালন করা হয়। পাশাপাশি অতীতে কালীপুজোর রাতে শ্মশানে আগত প্রথম মৃতদেহকে কেন্দ্র করে শবসাধনার প্রচলিত কাহিনিও রয়েছে। গভীর রাতে শ্মশানের পরিবেশকে জাগ্রত করার বিশেষ তন্ত্রক্রিয়াকে স্থানীয় ভাষায় বলা হয় শ্মশান জাগানোর খেলা। শ্মশানকে ঘিরে রয়েছে আরও নানা লোকবিশ্বাস। স্থানীয়দের একাংশের বিশ্বাস, দীর্ঘদিনের তন্ত্রসাধনার কারণে এই শ্মশানের পরিবেশে রয়েছে এক বিশেষ আধ্যাত্মিক আবহ। অপঘাতে মৃতদের আত্মার বিচরণ থেকে অদৃশ্য শক্তির উপস্থিতি। নানা কাহিনি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে প্রচলিত। যদিও এসব বিশ্বাসের কোনও বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই, তবুও সন্ধ্যার পর শ্মশান চত্বরের নিস্তব্ধতা আজও তৈরি করে গা ছমছমে অনুভূতি। একসময় যে শ্মশানের নাম শুনলেই সাধারণ মানুষের মনে ভয় তৈরি হত, আজ সেই মন্দিরেই কালীপুজোর রাতে উপচে পড়ে ভক্তদের ভিড়।
মন্দির সংস্কার হয়েছে, বেড়েছে যাতায়াতের সুবিধা, জঙ্গলও অনেকটাই পরিষ্কার হয়েছে। সাধক মণিলাল চক্রবর্তীর প্রয়াণের পর তাঁর পুত্র শ্যামল চক্রবর্তী এবং চক্রবর্তী পরিবারই ধারাবাহিকভাবে মন্দিরের সেবা-পুজোর দায়িত্ব সামলে আসছেন। একদিকে ১০৮টি নরমুণ্ড, পঞ্চমুণ্ডির আসন, শ্মশানসাধনার ইতিহাস। অন্যদিকে পশুবলি ছাড়াই দেবীর আরাধনা, আর মধ্যরাতে শিয়াল ভোগের প্রাচীন রীতি। সব মিলিয়ে দক্ষিণ বিষ্ণুপুরের মা করুণাময়ীর মন্দির যেন ইতিহাস, তন্ত্রসাধনা আর লোকবিশ্বাসের এক আশ্চর্য মেলবন্ধন। সময় বদলেছে, বদলেছে চারপাশের পরিবেশ। কিন্তু বদলায়নি প্রাচীন ঐতিহ্য। আজও শ্যামাপুজোর রাতে হাজার হাজার ভক্তের সমাগমে জেগে ওঠে এই শ্মশানকালী মন্দির। অন্ধকার শ্মশানের বুকেই যেন শতাব্দী পেরিয়েও নিজের রহস্যময় অস্তিত্ব ধরে রেখেছেন মা করুণাময়ী।