শ্রেয়সী বল, সাংবাদিক : পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধপরিস্থিতে ইজরায়েলের একের পর এক কর্মকাণ্ড বিতর্কের সৃষ্টি করছে। প্রথমে তো আমেরিকার মিত্র শক্তি হিসাবে ইরানে একাধিক হামলা। তারপর ইরান-আমেরিকার যুদ্ধবিরতির শুরুতেই লেবালনে হামলা। এবার গাজার মত সেদেশেও ইয়োলো লাইন স্থাপনের ঘোষনা ইজরায়েলের। কী এই ইয়োলো লাইন বা হলুদ রেখা ?

মুলত যুদ্ধের সময় একটা কৌশলগত সীমারেখা। সংঘাতের প্রেক্ষাপটেই এউ রেখার ব্যবহার হয়ে থাকে। এই রেখা অতিক্ষম করা ব্যক্তি বা বস্তু নিরাপত্তা বলয়ের বাইরে চলে যায়। প্রথম গাজা উপত্যকায় ইজরায়েলি বাহিনীর দ্বারা নির্ধারিত হয়েছিল এই নিরাপত্তা বা বাফার জোন। যা অক্টোবর ২০২৫-এর পর থেকে গাজাকে কার্যত দুই ভাগে বিভক্ত করেছে। এটি ইজরায়েল কর্তৃক দখলকৃত এলাকার একটি কৌশলগত সীমান্ত, যা বেসামরিক ফিলিস্তিনিদের জন্য অপ্রবেশযোগ্য বাফার জোন হিসেবে কাজ করে।
এককথায় এই হলুদ রেখার মাধ্যমে ইজরায়েলি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকা নির্ধারিত হয়। যা সাধারণ মানুষের জন্য তা অপ্রবেশযোগ্য থাকে।আইডিএফ তরফে জানানো হয়, লেবাননের বিভিন্ন টার্গেট এলাকায় এই সীমারেখা নির্ধারণ করা হয়েছে এবং বর্তমানে তাদের সামরিক কার্যক্রম এই রেখা পর্যন্ত বিস্তৃত রয়েছে। সংবাদমাধ্যম সূত্রের খবর, অন্তত ৫৫টি গ্রামের বাসিন্দাদের নিজ এলাকায় ফেরার অনুমতি দেওয়া হবে না। একই সঙ্গে যুদ্ধবিরতি চলাকালেও ওই সব এলাকায় ‘সন্ত্রাসী পরিকাঠামো’ ধ্বংসের অভিযান চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকবে বলে জানানো হয়েছে।
এমনিতেই ইরান-আমেরিকা যুদ্ধবিরতি চলাকালিন লেবানলে হামলা চালায় ইজরায়েল। এরপর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় ইজরায়েল এবং লেবাননের মধ্যে ১৬ এপ্রিল মধ্যরাত থেকে ১০ দিনের একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। যা ৩০ দিনের বেশি সময় ধরে চলা রক্তক্ষয়ী সংঘাতের অবসান ঘটিয়ে শান্তি আলোচনার সুযোগ তৈরি করে। যদিও এই বিরতি সত্ত্বেও, উভয় পক্ষ থেকে লঙ্ঘন বা গোলাবর্ষণের খবর পাওয়া গেছে। ফের লেবাননের যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে গোলাবর্ষণ করছে ইজরায়েল। আর্ন্তজাতিক সংবাদমাধ্যম সূত্রের খবর, ইজরায়েলি বুলডোজারগুলো দক্ষিণ লেবাননের বেশ কয়েকটি এলাকায় ধ্বংসযজ্ঞ ও ভূমি পরিষ্কারের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে ইজরায়েলি কামান বেইত লিফ, আল-কানতারা ও টুলের আশপাশের এলাকাগুলোতে গোলাবর্ষণ করছে। অন্যদিকে, দক্ষিণ সীমান্তের কাছে ইজরায়েলি গোলাবর্ষণ এবং বাড়িঘর ধ্বংসের খবর সত্ত্বেও হাজার হাজার বাস্তুচ্যুত লেবানিজ পরিবার নিজ বাড়িতে ফিরছেন।
তবে মার্কিন মধ্যস্থতায় ইজরায়েল এবং লেবাননের মধ্যে সরাসরি আলোচনার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে বলে মত রাজনৈতিক মহলের। এমনকি তা শুরু হওয়ার পর্যায়ে রয়েছে। তবে চলমান যুদ্ধ ও হামলা অব্যাহত থাকায় এই আলোচনার সাফল্য ও স্থায়ী যুদ্ধবিরতি নিয়ে বড় ধরনের সংশয় রয়েছে।আর্ন্তজাতিক সংবদমাধ্যম সূত্রের খবর,ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু ওয়াশিংটনে আলোচনার অনুমোদন দিয়েছেন। যার মূল লক্ষ্য হিজবুল্লাহর নিরস্ত্রীকরণ এবং আঞ্চলিক উত্তেজনা কমানো।মুলত এই আলোচনার মাধ্যমে দীর্ঘদিনের সীমান্ত বিরোধ নিষ্পত্তি এবং লেবাননের দক্ষিণ অংশে নিরাপত্তা নিশ্চিত করারও চেষ্টা চলছে। তবে এই আলোচনার ঘোষণা সত্ত্বেও, ইজরায়েলি সামরিক অভিযান এবং হিজবুল্লাহর সঙ্গে সংঘর্ষ চলছে, যা শান্তি প্রক্রিয়াকে ভঙ্গুর করে তুলছে। এই প্রেক্ষাপটে যুদ্ধবিরতি টিকিয়ে রাখা চ্যালেঞ্জিং বিষয় হয়ে দাড়িয়েছে। আশা করা হচ্ছে, তবে পরিস্থিতি অত্যন্ত সংবেদনশীল।
এদিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প লেবাননে সামরিক অভিযান বন্ধ করতে বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর ওপর তীব্র চাপ সৃষ্টি করেছেন, যার ফলে ইজরায়েলি প্রধানমন্ত্রী রাজনৈতিক ও কূটনৈতিকভাবে কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইজরায়েলকে কঠোর সতর্কবার্তা দিয়ে বলেছেন, ‘এখন যথেষ্ট হয়েছে’ এবং লেবাননে আর কোনো ধরনের বোমা হামলা চালানো যাবে না।
এককথায় বর্তমান পরিস্থিতি অনুযায়ী, ইজরায়েল ও লেবাননের মধ্যে যুদ্ধবিরতি আলোচনা ও সাময়িক যুদ্ধবিরতি চললেও, ভবিষ্যৎ অত্যন্ত অনিশ্চিত এবং সংঘাতের ঝুঁকি প্রবল। মার্কিন হস্তক্ষেপে ১০ দিনের একটি যুদ্ধবিরতি ঘোষিত হলেও, ইজরায়েল দক্ষিণ লেবাননে ১০ কিলোমিটার “নিরাপত্তা জোন” বজায় রাখার ও লক্ষ্যভেদী হামলার পরিকল্পনা করছে, যা নিশ্চিত শান্তির পথে বড় বাধা।